ঢাকার ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ বিল এখন অনেক পরিবারের মাসিক খরচের একটি বড় অংশ। গরমে এসি, শীতে গিজার, সারা বছর ফ্রিজ, ফ্যান, বাতি আর টিভি, সব মিলে মিটারের কাঁটা ঘোরে। এই বিল কমানোর জন্য এখন স্মার্ট হোমের নানা যন্ত্র বাজারে এসেছে। কিন্তু সব যন্ত্র সমান কাজের নয়।
প্রথমে বুঝতে হবে, ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ কোথায় বেশি খরচ হয়। সাধারণত সবচেয়ে বেশি খরচ হয় এয়ারকন্ডিশনার আর ফ্রিজে। তারপর আসে গিজার, ওয়াশিং মেশিন আর পুরনো ধরনের বাতি। যেসব যন্ত্র সারাক্ষণ চালু থাকে, যেমন ফ্রিজ, সেগুলোর খরচ কমানো কঠিন। কিন্তু যেসব যন্ত্র প্রয়োজনের সময় চালু হয়, সেগুলোতে সাশ্রয় করা যায়।
সেন্সর আর স্মার্ট সুইচ: ছোট যন্ত্র, ধীরে ধীরে সাশ্রয়
সবচেয়ে সহজ শুরু হলো মোশন সেন্সর। বাথরুম, বারান্দা, সিঁড়ি আর করিডরে সেন্সর লাগানো বাতি নিজে থেকে জ্বলে আর কেউ না থাকলে নিভে যায়। ঢাকার অনেক ফ্ল্যাটে বারান্দা আর করিডরের বাতি সারারাত জ্বলে থাকে, কারণ কেউ নেভাতে ভুলে যায়। সেন্সর সেই অপচয় বন্ধ করে।
স্মার্ট প্লাগও একই কাজ করে। টিভি, চার্জার আর সেট-টপ বক্স বন্ধ থাকলেও অল্প বিদ্যুৎ টানে। একে বলে স্ট্যান্ডবাই খরচ। স্মার্ট প্লাগ দিয়ে রাতে এসব যন্ত্রের বিদ্যুৎ একেবারে বন্ধ করা যায়, আবার ফোন থেকে চালুও করা যায়।
এই সাশ্রয় কতটুকু, তা নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। একটি পরিবার যদি বারান্দা আর করিডরের বাতি রাতে জ্বালিয়ে রাখার অভ্যাস বদলায়, তাহলে মাসের বিলে কিছুটা কমতি দেখা যাবে। তবে সঠিক অঙ্ক আগেভাগে বলা যায় না, কারণ প্রতিটি ফ্ল্যাটের ব্যবহার আলাদা। যারা নির্দিষ্ট শতাংশ সাশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের কথা যাচাই করে নেওয়া ভালো।
সৌরবিদ্যুৎ: ছাদ থাকলে ভাবা যায়
ঢাকার ফ্ল্যাটে সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সীমা হলো ছাদের জায়গা। একটি ফ্ল্যাটের মালিক একা ছাদ ব্যবহার করতে পারে না, ছাদ ভবনের সবাই মিলে ব্যবহার করে। তাই ছাদে সৌর প্যানেল বসাতে হলে ভবন কমিটির অনুমতি লাগে, আর সবার সঙ্গে ভাগাভাগির নিয়ম ঠিক করতে হয়।
তবে যেসব ভবনে কমিটি একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে সৌর প্যানেল দিয়ে লিফট, পানির পাম্প আর করিডরের বাতির বিদ্যুৎ চালানো যায়। এতে ভবনের সাধারণ বিদ্যুৎ বিল কমে, আর সেই সুবিধা সব ফ্ল্যাটের মালিক পায়। বাংলাদেশে নেট মিটারিং ব্যবস্থা আছে, যার মাধ্যমে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর জন্য বিতরণ কোম্পানির অনুমোদন লাগে।
একক ফ্ল্যাটের জন্য ছোট সৌর ব্যবস্থাও আছে। বারান্দায় ছোট প্যানেল বসিয়ে বাতি আর মোবাইল চার্জ চালানো যায়। এতে বড় সাশ্রয় হয় না, তবে লোডশেডিংয়ের সময় কিছুটা সুবিধা মেলে। কেনার আগে দেখে নিন, প্যানেলের ওয়ারেন্টি কতদিনের আর ব্যাটারি বদলাতে কত খরচ পড়বে। কারণ ব্যাটারির খরচ হিসাবের বাইরে রাখলে সাশ্রয়ের হিসাব ভুল হয়।
এসি আর ফ্রিজ: বড় খরচের জায়গায় সতর্কতা
স্মার্ট হোমের সবচেয়ে কাজের অংশ হলো এসির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। ইনভার্টার এসি পুরনো এসির চেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ করে, কারণ এটি তাপমাত্রা ধরে রাখতে ধীরে চলে। স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট দিয়ে ঘরের তাপমাত্রা ঠিক রাখা যায়, আর ঘরে কেউ না থাকলে এসি নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এসি যতই স্মার্ট হোক, ঘরের জানালা দিয়ে গরম বাতাস ঢুকলে তার কোনো লাভ নেই। জানালায় পর্দা দেওয়া, দরজার ফাঁক বন্ধ করা আর ঘরের ভেতরের গরম কমানো, এসব সাধারণ ব্যবস্থা অনেক সময় যন্ত্রের চেয়ে বেশি কাজ করে।
ফ্রিজের ক্ষেত্রে সাশ্রয় মানে সঠিক তাপমাত্রা রাখা আর দরজা বারবার না খোলা। পুরনো ফ্রিজ বদলে নতুন এনার্জি সাশ্রয়ী ফ্রিজ কেনা দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে, তবে কেনার আগে বিদ্যুৎ বিলের পার্থক্য হিসাব করে নেওয়া উচিত।
কেনার আগে যে হিসাব করবেন
স্মার্ট যন্ত্র কেনার আগে তিনটি প্রশ্ন করুন। প্রথমত, যন্ত্রটি কতদিনে তার দাম উঠিয়ে আনবে। একটি সেন্সর বাতির দাম কম, তাই কয়েক মাসে তার খরচ উঠে আসতে পারে। কিন্তু দামি স্মার্ট সিস্টেমের ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগে। দ্বিতীয়ত, যন্ত্রটি ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চলবে কি না, ভোল্টেজ ওঠানামা সহ্য করবে কি না। তৃতীয়ত, বিক্রেতা ওয়ারেন্টি আর সার্ভিস দেবে কি না।
বাজারে অনেক যন্ত্র আছে, যেগুলো দেখতে আকর্ষণীয় কিন্তু ঢাকার ফ্ল্যাটে কাজ করে না। বিদেশি ব্র্যান্ডের কিছু যন্ত্রের অ্যাপ বাংলাদেশে ঠিকমতো চলে না, আবার কিছু যন্ত্রের পার্টস পাওয়া যায় না। কেনার আগে দোকানে চালিয়ে দেখে নেওয়া ভালো।
স্মার্ট হোম মানে শুধু যন্ত্র কেনা নয়। এর মানে হলো বিদ্যুৎ কোথায় খরচ হচ্ছে, তা জানা আর সেই অনুযায়ী অভ্যাস বদলানো। সেন্সর, স্মার্ট প্লাগ আর সৌর প্যানেল সেই কাজে সাহায্য করে। তবে আসল সাশ্রয় আসে বুঝেশুনে ব্যবহার থেকে, আর সেটা কোনো যন্ত্র একা করে দিতে পারে না।


