ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার সময় ক্রেতারা দাম, জায়গা আর ফ্ল্যাটের আয়তন নিয়ে ভাবেন। কিন্তু কেনার পর প্রতি মাসে যে খরচটি নিয়মিত আসে, সেটি অনেকেই কেনার আগে জিজ্ঞেস করেন না। সেটি সার্ভিস চার্জ। ফ্ল্যাটের দাম একবার দিতে হয়, সার্ভিস চার্জ দিতে হয় যতদিন ভবনে থাকবেন। তাই এই খরচটি কেনার আগেই বুঝে নেওয়া জরুরি।
সার্ভিস চার্জ নিয়ে বিভ্রান্তির বড় কারণ, এর কোনো একক নিয়ম নেই। একেক ভবনে হিসাব একেক রকম। কোনো ভবনে চার্জ ধরা হয় ফ্ল্যাটের আয়তন অনুযায়ী, কোনো ভবনে সব ফ্ল্যাটে সমান। কোথাও জেনারেটরের জ্বালানি আলাদা ধরা হয়, কোথাও একসঙ্গে। ক্রেতা হিসেবে আপনার কাজ হলো, কেনার আগেই ভবনের আসল হিসাবটি হাতে নেওয়া।
সার্ভিস চার্জে কী কী থাকে
সাধারণত সার্ভিস চার্জ দিয়ে চলে ভবনের যৌথ খরচ। লিফট চালানো ও তার নিয়মিত সার্ভিস, জেনারেটরের জ্বালানি আর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তাকর্মীর বেতন, সিঁড়ি আর কমন জায়গা পরিষ্কার রাখা, পানির পাম্প চালানো, কমন জায়গার বিদ্যুৎ বিল আর ভবনের ছোটখাটো মেরামত। কোনো ভবনে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ছাদের বাগান বা কমন হলের খরচ।
কেনার আগে জিজ্ঞেস করুন, এই তালিকার কোন কোনটি চার্জের ভেতরে আছে আর কোনটি আলাদা নেওয়া হয়। অনেক ভবনে জেনারেটরের জ্বালানি আলাদা ভাগ করে নেওয়া হয়, আবার কোথাও তা চার্জের ভেতরেই ধরা থাকে। এই পার্থক্যটুকু না জানলে মাস শেষে বিল দেখে অবাক হতে হয়।
চার্জ কীভাবে ঠিক হয়
ভবনের মালিক সমিতি বা ব্যবস্থাপনা কমিটি সার্ভিস চার্জ ঠিক করে। সাধারণ নিয়ম হলো, ফ্ল্যাটের আয়তন অনুযায়ী ভাগ। বড় ফ্ল্যাটের মালিক একটু বেশি দেন, ছোট ফ্ল্যাটের মালিক একটু কম। তবে কোনো কোনো ভবনে সবাই সমান দেন, বিশেষ করে যেখানে ফ্ল্যাটের আয়তনে খুব একটা পার্থক্য নেই।
ভালো ভবনে বছরে অন্তত একবার হিসাব পেশ করা হয়। কত টাকা উঠল, কোথায় কত খরচ হলো, হাতে কত থাকল, সব মালিককে জানানো হয়। কেনার আগে এই বার্ষিক হিসাবটি দেখতে চান। যে ভবনে হিসাবের খাতা পরিষ্কার, সেখানে চার্জ নিয়ে ঝামেলাও কম।
কেনার আগে যে হিসাব দেখবেন
প্রথমে গত ছয় মাসের সার্ভিস চার্জের রসিদ দেখুন। বিক্রেতা যদি রসিদ দেখাতে না পারেন, সেটিই একটি সংকেত। তারপর জিজ্ঞেস করুন, কোনো ফ্ল্যাটের বকেয়া আছে কি না। একটি ভবনে অনেক মালিকের বকেয়া জমে থাকলে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত যাঁরা দেন, তাঁদের ওপর চাপ পড়ে।
লিফটের সার্ভিস চুক্তি আছে কি না, জেনারেটর কত পুরোনো, পানির পাম্প কবে বদলানো হয়েছে, এসব জিজ্ঞেস করুন। লিফট বা জেনারেটর বদলাতে হলে খরচটি সব মালিককে ভাগ করে দিতে হয়, আর সেই অঙ্কটি ছোট হয় না। কেনার আগে এই খরচের সম্ভাবনা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
বকেয়া থাকলে কী হয়
আগের মালিকের বকেয়া সার্ভিস চার্জ অনেক সময় নতুন মালিকের ঘাড়ে এসে পড়ে। ভবনের কমিটি বকেয়া আদায়ের জন্য নতুন মালিকের কাছেই যাবে, কারণ ফ্ল্যাটটি এখন তাঁর নামে। তাই কেনার আগে কমিটির কাছ থেকে লিখিত ছাড়পত্র নিন, যাতে লেখা থাকে এই ফ্ল্যাটের নামে কোনো বকেয়া নেই। এই এক টুকরো কাগজ পরে অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচায়।
কেনার চুক্তিতে লিখে রাখুন, হস্তান্তরের আগের সব বকেয়ার দায় বিক্রেতার। মুখের কথায় নয়, লিখিতভাবে। এতে পরে কেউ দায় এড়াতে পারবেন না।
নতুন ভবন বনাম পুরোনো ভবন
নতুন ভবনে প্রথম দিকে সার্ভিস চার্জ কম মনে হতে পারে। লিফট নতুন, জেনারেটর নতুন, মেরামতের খরচ কম। কিন্তু কয়েক বছর পর যখন যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়, তখন খরচ বাড়ে। পুরোনো ভবনে উল্টো চিত্র। সেখানে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আগে থেকেই বেশি, কিন্তু হিসাবটি সাধারণত পরিষ্কার থাকে। কত লাগে, তা সবাই জানে।
তাই নতুন ভবন দেখলে শুধু আজকের চার্জ নয়, পাঁচ বছর পরের খরচের কথাও ভাবুন। পুরোনো ভবন দেখলে আজকের চার্জটি মন দিয়ে দেখুন, কারণ সেটিই আপনার মাসিক খরচ হবে।
সার্ভিস চার্জ ছোট খরচ মনে হলেও বছরে জমে তা বড় অঙ্ক হয়। কেনার আগে হিসাবটি দেখে নিলে পরে আর অপ্রীতিকর চমক থাকে না। ফ্ল্যাট পছন্দ হলে সার্ভিস চার্জের খাতাটি দেখতে চান, কমিটির একজনের সঙ্গে কথা বলুন, আর বকেয়ার ছাড়পত্রটি লিখিতভাবে নিন। এই তিনটি কাজ আপনার নতুন বাসার প্রথম মাসগুলো অনেক সহজ করে দেবে।
এটি সাধারণ তথ্য, আর্থিক পরামর্শ নয়।




