ঢাকায় প্রথম ফ্ল্যাট কিনতে চাওয়া পরিবারগুলোর গল্পটা প্রায় একই। বেতন আসে, খরচ হয়, মাস শেষে হাতে কিছু থাকে না। ফ্ল্যাটের দাম দেখে মনে হয়, এটা আমাদের জন্য নয়। আসল বাধাটা কিন্তু পুরো দাম নয়। বাধাটা ডাউন পেমেন্ট, সেই টাকাটা যা ব্যাংক দেয় না, নিজেকে জমাতে হয়।
ধরা যাক, ফ্ল্যাটের দাম ৫০ লাখ টাকা। ২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হলে লাগবে ১০ লাখ টাকা। ৭০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে ২০ শতাংশ মানে ১৪ লাখ টাকা। এই টাকাটা হাতে না থাকলে ব্যাংকের ঋণের আলোচনাই শুরু হয় না। তাই প্রথম কাজ দাম দেখা নয়, ডাউন পেমেন্টের লক্ষ্য ঠিক করা।
মাসের হিসাবটা মিলিয়ে নিন
হিসাবটা সোজা, কিন্তু সৎ হতে হয়। মাসে ১৫ হাজার টাকা জমালে ১০ লাখ টাকা হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ বছর সাত মাস। মাসে ২০ হাজার টাকা জমালে লাগে প্রায় চার বছর দুই মাস। মাসে ৩০ হাজার টাকা জমালে লাগে প্রায় দুই বছর নয় মাস। ১৪ লাখ টাকার লক্ষ্য হলে মাসে ২০ হাজার টাকা জমাতে লাগবে প্রায় পাঁচ বছর দশ মাস, আর মাসে ৩০ হাজার টাকা জমালে প্রায় তিন বছর এগারো মাস।
এই হিসাবের মধ্যে কোনো সুদ ধরা হয়নি। সঞ্চয়ে সুদ পেলে সময় কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু হিসাবটা সেভাবেই করা ভালো, যেন সুদের ওপর ভরসা করতে না হয়। আর একটা কথা, এই টাকাটা প্রতি মাসে নিয়ম করে জমাতে হবে। দুই মাস জমিয়ে তিন মাস থেমে গেলে লক্ষ্য পিছিয়ে যাবে।
বেতনের দিনেই আলাদা করে রাখুন
যারা ডাউন পেমেন্ট জমাতে পেরেছে, তাদের প্রায় সবার একটা অভ্যাস মিলে যায়। বেতন পাওয়ার দিনেই নির্দিষ্ট টাকাটা আলাদা হিসাবে চলে যায়। মাস শেষে যা বাঁচবে, তা জমানোর পরিকল্পনা প্রায় কখনোই কাজ করে না। কারণ মাস শেষে বাঁচার মতো কিছু থাকে না।
একটা আলাদা সঞ্চয়ী হিসাব খুলে রাখুন, যার এটিএম কার্ড সঙ্গে রাখবেন না। বেতনের দিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা চলে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে আরও ভালো। পরিবারের সবাই মিলে লক্ষ্যটা জানলে খরচ কমানো সহজ হয়। ছোট ছোট খরচ, যেমন বাইরে খাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, মাসে মিলে অনেক টাকা হয়।
রেজিস্ট্রেশনের টাকাটা আলাদা
ডাউন পেমেন্ট জমিয়ে ফেললেই কাজ শেষ নয়। ফ্ল্যাটের দামের ওপরে রেজিস্ট্রেশন খরচ আছে। স্ট্যাম্প ডিউটি ১.৫ শতাংশ, রেজিস্ট্রেশন ফি ১ শতাংশ, সিটি করপোরেশনের ভেতরে স্থানীয় সরকার কর ২ শতাংশ, আর নতুন ফ্ল্যাটে ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ভ্যাট ২ শতাংশ। নামজারির ফি ১,১৭০ টাকা।
৭০ লাখ টাকার নতুন ফ্ল্যাটে, ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত, সিটি করপোরেশনের ভেতরে এই খরচ দাঁড়ায় দামের প্রায় ৬.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪.৫৫ লাখ টাকা, সঙ্গে নামজারির ১,১৭০ টাকা। এই টাকাটা রেজিস্ট্রেশনের সময় লাগে, আর ব্যাংকের ঋণে সাধারণত এটা ধরা থাকে না। তাই ডাউন পেমেন্টের পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশনের জন্য আলাদা একটা তহবিল রাখা উচিত।
আয় বাড়লে সঞ্চয়ও বাড়ান
বেতন বাড়লে সঞ্চয়ের অঙ্কও বাড়ানো উচিত। অনেক পরিবার বেতন বাড়ার পর খরচ বাড়িয়ে দেয়, সঞ্চয় একই রাখে। এতে লক্ষ্য পিছিয়ে যায়। বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের অঙ্কটা অন্তত কিছুটা বাড়িয়ে নিলে ডাউন পেমেন্টের তারিখ এগিয়ে আসে। উৎসব ভাতা বা বোনাস পেলে তার একটা অংশ সরাসরি সঞ্চয়ের হিসাবে পাঠিয়ে দিন, হাতে রেখে খরচ করার আগেই। বছরে একবার বসে হিসাবটা মিলিয়ে নিন: কত জমেছে, আর কত বাকি, মাসের অঙ্কটা ঠিক আছে কি না।
শুরুটা ছোট হোক, তবু শুরু হোক
অনেক পরিবার ভাবে, মাসে ১০ হাজার টাকা জমিয়ে কী হবে। হবে, কারণ ১০ হাজার টাকা জমানো মানেই অভ্যাস তৈরি হওয়া। আয় বাড়লে সঞ্চয়ের অঙ্ক বাড়ানো যায়। বোনাস বা উৎসব ভাতার একটা অংশ সরাসরি সঞ্চয়ে দিলে লক্ষ্য আরও কাছে আসে।
ফ্ল্যাট কেনা একদিনের সিদ্ধান্ত নয়। এটি কয়েক বছরের পরিকল্পনা। আজ থেকে মাসে নির্দিষ্ট একটা অঙ্ক আলাদা করে রাখলে, কয়েক বছর পর সেই টাকাটাই ডাউন পেমেন্ট হয়ে দরজা খুলে দেবে।
এটি সাধারণ তথ্য, আর্থিক পরামর্শ নয়।


