জমি কেনার গল্পে সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় তাড়াহুড়োয়। জমি দেখে পছন্দ হলো, দামে মিলল, আর টাকা দেওয়ার কথা উঠল। কিন্তু জমির আসল পরিচয় থাকে কাগজে, মাটিতে নয়। দলিল, খতিয়ান, নামজারি আর খাজনার রসিদ, এই চারটি কাগজ মিলিয়ে না দেখলে পরে যে ঝামেলা আসে, তা সামলানো কঠিন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একদিনের কাজ এই ঝুঁকির বেশির ভাগই কমিয়ে দেয়।

জমির কাগজ যাচাই কোনো জটিল বিদ্যা নয়। ধাপগুলো জানা থাকলে একজন সাধারণ ক্রেতাও বুঝতে পারবেন কোথায় থামতে হবে আর কোথায় প্রশ্ন তুলতে হবে।

দলিলের শৃঙ্খল মেলান

Estate News — Find your dream home

প্রথমে দেখুন বিক্রেতার দলিল। দলিলে লেখা থাকে বিক্রেতা কীভাবে জমিটি পেয়েছেন, কবে পেয়েছেন, আর দলিলটি কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কবে রেজিস্ট্রি হয়েছে। রেজিস্ট্রি নম্বর, অফিসের নাম আর তারিখ মিলিয়ে দেখুন।

একটি দলিল যথেষ্ট নয়। জমির মালিকানা বোঝার জন্য গত পঁচিশ বছরের মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখতে হয়। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ৫২এ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি বিক্রয় দলিলে এই পঁচিশ বছরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকতে হয়। বিক্রেতার দেওয়া ফটোকপি নয়, প্রতিটি দলিলের সার্টিফায়েড কপি নিন। কেনা, উপহার, ভাগবাঁটোয়ারা, উত্তরাধিকার বা আদালতের রায়, প্রতিটি ধাপে জমিটি আসলেই হাতবদল হয়েছে কি না, তা মেলান। কোনো ধাপে ফাঁক থাকলে সেখানে থামুন।

খতিয়ান পড়তে শিখুন

খতিয়ান হলো জমির অধিকারের সরকারি রেকর্ড। এতে লেখা থাকে মৌজায় কোন দাগে কতটুকু জমি, মালিক কে, তাঁর অংশ কতটুকু আর খাজনা কত। খতিয়ানের ধারা চারটি: সিএস, এসএ, আরএস আর বিএস। সিএস সবচেয়ে পুরোনো জরিপের রেকর্ড, এসএ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণের পরের, আরএস সংশোধিত আর বিএস বাংলাদেশ জরিপের। ঢাকার মতো শহর এলাকায় সিটি জরিপের খতিয়ানও থাকে।

নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ আর অংশ, এই চারটি বিষয় সব খতিয়ানে একই থাকতে হবে। কোনো একটিতে গরমিল থাকলে কারণ জিজ্ঞেস করুন। জমির খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি পাওয়া যায় স্থানীয় ভূমি অফিসে, আর অনেক জেলার ক্ষেত্রে land.gov.bd পোর্টালে ই-খতিয়ান দেখা যায়।

সাব-রেজিস্ট্রিতে যা খুঁজবেন

দলিল যেখানে রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই যাচাই করতে হয়। রেজিস্ট্রির বই ও সূচি সবার জন্য খোলা। সেখানে আগের বিক্রি, বন্ধক, বায়না আর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির রেকর্ড থাকে। জমিটির ওপর কোনো দায় আছে কি না জানতে এনকামব্রান্স সার্টিফিকেট চাইতে পারেন। এই সার্টিফিকেটে ধরা পড়ে জমিটি বন্ধক আছে কি না, কোনো মামলা বা দাবি ঝুলছে কি না।

Advertise on Estate News

অফিসে গিয়ে দলিলের রেজিস্ট্রি নম্বর দিয়ে খোঁজ নিন। বিক্রেতা যে দলিল দেখিয়েছেন, অফিসের রেকর্ডে তার সঙ্গে মিল আছে কি না, তা নিজে দেখে নিন। মুখের কথায় নয়, অফিসের খাতায়।

নামজারি আর খাজনার রসিদ

জমি কেনার পর মালিকের নাম সরকারি রেকর্ডে ওঠানোর কাজটিই নামজারি। বিক্রেতার নামজারি খতিয়ান আর ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ দেখুন। নামজারির দাগ আর খতিয়ান নম্বর দলিলের সঙ্গে মিলছে কি না, তা যাচাই করুন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে গিয়ে বা land.gov.bd পোর্টালে নামজারির অবস্থা দেখা যায়।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ অনুযায়ী, সর্বশেষ খতিয়ান বিক্রেতার নামে না থাকলে আর হালনাগাদ খাজনা দেওয়া না থাকলে জমি বিক্রি, দান বা দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না। তাই বিক্রেতার হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ দেখে নিন। ই-নামজারির সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা। নামজারি হতে সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ কর্মদিবস লাগে।

জমিতে গিয়ে মাপ মেলান

কাগজ মিললেও কাজ শেষ নয়। জমিতে গিয়ে দেখুন। দাগের সীমানা, জমির আকার আর দখলে কে আছে, তা নিজে দেখুন। স্থানীয় আমিন বা জরিপকারীকে দিয়ে মৌজা ম্যাপের সঙ্গে মাপ মিলিয়ে নিন। কাগজে যতটুকু লেখা, মাটিতে ততটুকু আছে কি না, এটিই আসল পরীক্ষা।

ভূমি অফিসে খোঁজ নিন, জমিটি খাস, অর্পিত বা অধিগ্রহণের তালিকায় আছে কি না। পাশের জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁরা অনেক সময় কাগজে না থাকা সত্য জানেন।

জমি কেনা জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। একদিন সাব-রেজিস্ট্রি আর ভূমি অফিসে ঘুরে, দলিলের শৃঙ্খল মিলিয়ে, নামজারি আর খাজনার রসিদ দেখে নিলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত শক্ত হয়। তাড়াহুড়ো করে টাকা দেওয়ার চেয়ে ধীরে কাগজ দেখে নেওয়া অনেক সস্তা।

এটি সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়।