ঢাকার বাইরে হোক বা শহরের ভেতরে, জমি কেনার গল্পটা প্রায় সবার একই রকম। দলিল হলো, টাকা গেল, মনে হলো কাজ শেষ। তারপর একদিন দেখা গেল, খাজনা দিতে গিয়ে নাম মিলছে না, কিংবা জমি বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতা জিজ্ঞেস করছে, খতিয়ানে নাম কার। সেই নামটাই মিউটেশন, যাকে সরকারি ভাষায় বলে নামজারি।
মিউটেশন মানে, জমির খতিয়ানে আগের মালিকের নাম কেটে নতুন মালিকের নাম বসানো। রেজিস্ট্রি দলিল মালিকানা বদলের প্রমাণ, আর মিউটেশন সেই বদলকে সরকারি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। দলিল থাকলেও মিউটেশন না থাকলে খাজনা, রেকর্ড, এমনকি ভবিষ্যতে বিক্রির সময় ঝামেলা তৈরি হয়। তাই জমি কেনার পর এ কাজটি ফেলে রাখা ঠিক নয়।
আবেদনের আগে যা যা লাগবে
আবেদন করতে গেলে কাগজপত্র গুছিয়ে নেওয়া প্রথম কাজ। মূল দলিলের সার্টিফায়েড কপি, বিক্রেতার নামে আগের খতিয়ান, জমির দাগ নম্বর আর মৌজার তথ্য, ক্রেতা ও বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, আর হালনাগাদ খাজনার রসিদ, এই কয়টি কাগজ ছাড়া আবেদন এগোয় না। জমি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া হয়, তাহলে ওয়ারিশ সনদ আর বণ্টন সংক্রান্ত কাগজ লাগবে।
অনেকেই ভুল করেন দলিলের মূল কপি অফিসে জমা দিয়ে। মূল কপি নিজের কাছে রাখুন, অফিসে দিন সার্টিফায়েড কপি। আর প্রতিটি কাগজের এক সেট ফটোকপি নিজের ফাইলে রাখুন। ভূমি অফিসে একবার কাগজ হারালে দ্বিতীয়বার জোগাড় করা যে কত কঠিন, সেটা যারা ভুক্তভোগী তারাই জানেন।
আবেদন থেকে শুনানি পর্যন্ত
আবেদন জমা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা সিটি এলাকায় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে, জমি যে মৌজায় সেখানে। এখন অনলাইনে আবেদন করার ব্যবস্থাও আছে, তবে অনেক এলাকায় এখনো সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদন করাই স্বাভাবিক। সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা। এর বাইরে কোনো বাড়তি টাকা চাওয়া হলে সেটা নিয়মের বাইরে।
আবেদন জমা পড়লে ভূমি অফিস কাগজ যাচাই করে। তহশিলদার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জমির রেকর্ড মিলিয়ে দেখেন, দাগ নম্বর ঠিক আছে কি না, আগের মালিকের নাম আর দলিলের নাম মেলে কি না। এরপর শুনানির তারিখ দেওয়া হয়। শুনানিতে ক্রেতা ও বিক্রেতা, বা তাদের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। কারো আপত্তি না থাকলে এবং কাগজ ঠিক থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির আদেশ দেন।
শুনানির দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। বিক্রেতা যদি উপস্থিত না থাকেন, কাজ আটকে যেতে পারে। তাই আবেদনের আগেই বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে রাখুন, শুনানির দিন তিনি আসবেন কি না। যারা দূরে থাকেন, তারা প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে প্রতিনিধির ক্ষমতাপত্র লাগবে।
নামজারির পর যা করবেন
আদেশের পর নতুন খতিয়ান তৈরি হয়। সেখানে ক্রেতার নাম, দাগ নম্বর আর জমির পরিমাণ ওঠে। নতুন খতিয়ানের কপি সংগ্রহ করুন, আর যাচাই করে নিন নামের বানান, দাগ নম্বর আর জমির পরিমাণ ঠিক আছে কি না। ভুল থাকলে তখনই সংশোধনের আবেদন করুন, পরে নয়।
এরপর নিয়মিত খাজনা দিন নিজের নামে। খাজনার রসিদে নিজের নাম দেখা মানেই মিউটেশন কাজ করেছে। এই রসিদ ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, ব্যাংক ঋণ, এমনকি সন্তানদের মধ্যে ভাগের সময়ও কাজে লাগবে।
যেখানে সাবধান হতে হবে
তিনটি বিষয়ে সতর্ক থাকুন। এক, দালালের হাতে পুরো কাজ ছেড়ে দেবেন না। আবেদন আপনি নিজে করুন, শুনানিতে নিজে যান। দুই, ফির বাইরে বাড়তি টাকা চাইলে লিখিত রসিদ চান, মুখের কথায় টাকা দেবেন না। তিন, জমি কেনার আগেই যাচাই করুন সেই জমির নামজারি নিয়ে কোনো মামলা বা আপত্তি আছে কি না। কেনার পর আপত্তি উঠলে সমাধান অনেক কঠিন।
নামজারি কোনো বড় কাজ নয়, তবে ফেলে রাখা কাজ। একবার হয়ে গেলে জমির মালিকানা পরিষ্কার থাকে, খাজনা দেওয়া সহজ হয়, আর ভবিষ্যতে বিক্রি বা উত্তরাধিকারের পথ খোলা থাকে। জমি কেনার আনন্দটা তখনই পুরো হয়, যখন খতিয়ানে নিজের নামটা ঠিকঠাক ওঠে।




