জমি কিনতে গিয়ে মানুষ দলিল দেখে, দাম ঠিক করে, বায়না দেয়। খতিয়ান দেখার কাজটা অনেক সময় পরে হয়, অথবা হয়ই না। অথচ জমির মালিকানা নিয়ে যত ঝামেলা হয়, তার বড় অংশের শুরু এই কাগজটাতেই। খতিয়ান পড়তে জানলে জমি কেনার আগেই বোঝা যায়, বিক্রেতা আসলেই ওই জমির মালিক কি না, জমির পরিমাণ দলিলের সঙ্গে মেলে কি না, আর আগের মালিকদের নামের ধারাবাহিকতায় কোনো ফাঁক আছে কি না।
খতিয়ান হলো জমির স্বত্বের রেকর্ড। প্রতিটি মৌজায়, প্রতিটি জমির জন্য এই রেকর্ডে লেখা থাকে মালিকের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি আর সরকারকে দেওয়ার খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ। এটি মালিকানার দলিল নয়, মালিকানা আর দখলের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এই পার্থক্যটা মনে রাখা জরুরি: শুধু খতিয়ানে নাম থাকলেই জমি বিক্রি করা যায় না, দলিল আর নামজারিও লাগে।
চার জরিপের চার খতিয়ান
বাংলাদেশে খতিয়ান মূলত চার ধরনের। সবচেয়ে পুরোনো সিএস খতিয়ান, অর্থাৎ ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে। ব্রিটিশ আমলে এই জরিপ হয়েছিল, ১৮৮০ এর দশকে শুরু হয়ে পরের কয়েক দশক ধরে চলেছিল। অনেক জমির শিরোনাম যাচাইয়ের মূল ভিত্তি এই সিএস খতিয়ান, কারণ এটাই সবচেয়ে পুরোনো প্লটভিত্তিক রেকর্ড।
এরপর এসএ খতিয়ান, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ জরিপের রেকর্ড। আরএস খতিয়ান হলো সংশোধনী জরিপ, আগের রেকর্ডের ভুল সংশোধনের জন্য করা। সবশেষে বিএস খতিয়ান, বাংলাদেশ জরিপ, বর্তমানে সবচেয়ে নতুন জরিপের রেকর্ড। শহর এলাকায় একে সিটি জরিপও বলা হয়। নতুন করে এখন বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে বা বিডিএসের কাজ চলছে।
জমি কেনার সময় এই চারটি রেকর্ডেই একই জমিকে খুঁজে দেখতে হয়। এক জরিপ থেকে আরেক জরিপে দাগ নম্বর বদলে যায়, জমি ভাগ হয়, আবার একত্র হয়। তাই মৌজা মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি জরিপে জমিটিকে খুঁজে বের করতে হয়।
মৌজা, দাগ আর জেএল নম্বর
খতিয়ানের ওপরে লেখা থাকে মৌজার নাম। মৌজা হলো ভূমি প্রশাসনের ছোট একক, একেকটি এলাকার জমির রেকর্ড মৌজা অনুযায়ী সাজানো থাকে। প্রতিটি মৌজার একটি নম্বর থাকে, যাকে জেএল নম্বর বলা হয়। মৌজার ভেতরে প্রতিটি জমির খণ্ডের একটি নম্বর থাকে, সেটাই দাগ নম্বর। মৌজা মানচিত্রে প্রতিটি দাগের সীমানা আঁকা থাকে।
খতিয়ানে আরও থাকে খতিয়ান নম্বর, মালিকের অংশ বা হিস্যা, জমির শ্রেণি যেমন নাল, ভিটি বা বসতবাড়ি, আর মোট জমির পরিমাণ। মালিক একাধিক হলে প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে লেখা থাকে। কেনার আগে এই অংশের হিসাব মিলিয়ে দেখা দরকার। বিক্রেতা যদি পুরো জমির মালিক না হন, শুধু নিজের অংশ বিক্রি করতে পারবেন।
কোথায় ভুল থাকে
খতিয়ানে ভুলের ধরন কয়েক রকম। নামের বানান ভুল, দাগ নম্বর ভুল, জমির পরিমাণ কম-বেশি, মালিকের অংশ ভুল লেখা, এগুলো প্রায়ই দেখা যায়। আরও বড় ঝুঁকি হলো ধারাবাহিকতায় ফাঁক। সিএসে একজনের নাম, আরএসে আরেকজনের, কিন্তু মাঝখানে মালিকানা বদলের দলিল নেই। এমন জমি কিনলে পরে অন্য কেউ দাবি তুলতে পারে।
যাচাইয়ের নিয়ম তাই সহজ: নাম, দাগ, জমির পরিমাণ আর অংশ, এই চারটি জিনিস প্রতিটি জরিপের খতিয়ানে মিলিয়ে দেখুন। কোনো পরিবর্তন থাকলে তার পেছনে দলিল, উত্তরাধিকার বা আদালতের রায় আছে কি না, তা খুঁজুন। জমি সরেজমিনে মেপে দেখুন, দাগের সীমানা মাটিতে যা আছে, মানচিত্রের সঙ্গে মেলে কি না।
নামজারি আর সার্টিফায়েড কপি
জমি কিনলে নামজারি করতে হয়, অর্থাৎ রেকর্ডে আগের মালিকের নামের বদলে নতুন মালিকের নাম তোলা। এই নামজারি খতিয়ানই কেনার পর আপনার রেকর্ড। নামজারি না হলে পরে জমি বিক্রি করা বা ব্যাংক ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। ভূমি উন্নয়ন করের রসিদও হালনাগাদ রাখতে হয়।
খতিয়ান আর মৌজা মানচিত্রের সার্টিফায়েড কপি ইপর্চা ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করা যায়, অথবা জেলা রেকর্ড রুম থেকে নেওয়া যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ফি অনুযায়ী সার্টিফায়েড খতিয়ানের কপির দাম ১২০ টাকা আর মৌজা মানচিত্রের দাম প্রতি শিট ৫৪৫ টাকা। অনলাইনে পাওয়া কপি যাচাইয়ের কাজে লাগে, তবে আদালত বা ভূমি অফিসের কাজে সার্টিফায়েড কপিই চাওয়া হয়।
খতিয়ান পড়া শেখা মানে জমি কেনার আগে চোখ খুলে দেখা। দলিল, খতিয়ান, মৌজা মানচিত্র আর সরেজমিন মাপ, এই চারটি একসঙ্গে মিললে তবেই জমির গল্পটা সম্পূর্ণ হয়।


