জমি কিনতে গেলে প্রথমে জমিটাকে চিনতে হয়। বাড়ি দেখা যায়, রাস্তা দেখা যায়, কিন্তু জমির আসল পরিচয় থাকে কাগজে। সেই পরিচয়ের মূল নথি হলো খতিয়ান। খতিয়ান হলো সরকারি রেকর্ড, যেখানে লেখা থাকে কোন মৌজায়, কোন দাগে, কতটুকু জমি, আর তার মালিক হিসেবে কার নাম রেকর্ড করা আছে। দাগ নম্বর হলো সেই জমির নম্বর — মৌজার মানচিত্রে প্রতিটি খণ্ড জমির আলাদা পরিচিতি।
যিনি জমি কিনতে চান, তাঁর প্রথম কাজ হলো বিক্রেতার কথা আর খতিয়ানের কথা মিলিয়ে দেখা। বিক্রেতা যে জমি দেখাচ্ছেন, খতিয়ানে সেই জমির দাগ নম্বর, পরিমাণ আর মালিকের নাম একই কি না — এই মিলটাই আসল যাচাই। মিল না থাকলে সেখানে থামতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, তাড়াহুড়ো করা যায় না।
সিএস, আরএস, বিএস — তিনটি রেকর্ডের গল্প
বাংলাদেশে জমির রেকর্ড একবারে তৈরি হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ হয়েছে, আর প্রতিটি জরিপের নিজস্ব খতিয়ান আছে। সিএস হলো প্রথম দিকের জরিপের রেকর্ড, আরএস হলো পরের সংশোধিত জরিপের রেকর্ড, আর বিএস হলো আরও পরের জরিপের রেকর্ড। সব এলাকায় সব রেকর্ড একইভাবে প্রযোজ্য নয়, আর কোন এলাকায় কোন রেকর্ড সর্বশেষ — সেটা ভূমি অফিস থেকে জানতে হয়।
এই ধারাবাহিকতাটা বোঝা জরুরি, কারণ মালিকানার ধারাও এই রেকর্ডগুলোর মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আগের রেকর্ডে একজনের নাম, পরের রেকর্ডে আরেকজনের নাম — এই পরিবর্তনের পেছনে দলিল, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো বৈধ কারণ থাকতে হবে। কারণ ছাড়া নাম বদল, বা হঠাৎ করে মিলহীন তথ্য, যাচাইয়ের দাবি রাখে।
খতিয়ান পড়বেন যেভাবে
খতিয়ান পড়া কঠিন নয়, যদি জানা থাকে কী দেখতে হবে। প্রথমে দেখুন মৌজার নাম আর জেএল নম্বর — এটা এলাকার পরিচয়। তারপর খতিয়ান নম্বর আর দাগ নম্বর — এটা জমির পরিচয়। তারপর মালিকের নাম আর অংশের পরিমাণ — কে কত অংশের মালিক। তারপর জমির শ্রেণি আর পরিমাণ — জমিটা কী ধরনের, কতটুকু।
একটি খতিয়ানে একাধিক মালিকের নাম থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে বিক্রেতা পুরো জমির মালিক, নাকি শুধু একটি অংশের। অংশের মালিক পুরো জমি বিক্রি করতে পারেন না। আবার একই দাগে একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে। তাই শুধু একটি কাগজ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয় — সংশ্লিষ্ট সব কাগজ একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
সাধারণ অমিল যেগুলো চোখে পড়ে
যাচাই করতে গিয়ে কয়েক ধরনের অমিল প্রায়ই দেখা যায়। নামের বানানে পার্থক্য হতে পারে — এক কাগজে এক রকম, আরেক কাগজে আরেক রকম। পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে — দলিলে এক পরিমাণ, খতিয়ানে আরেক পরিমাণ। দাগ নম্বরে ভুল হতে পারে — একটি সংখ্যার হেরফের মানেই অন্য জমি। আবার মালিকের অংশ নিয়েও বিভ্রান্তি হতে পারে — কাগজে অংশ এক রকম, মুখে দাবি আরেক রকম।
এই অমিলগুলো মানেই সবসময় জালিয়াতি নয়। পুরোনো রেকর্ডে ভুল থাকতে পারে, বানান বদলাতে পারে, সংশোধনের প্রক্রিয়াও আছে। কিন্তু অমিল মানেই প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর কাগজে আর সরকারি রেকর্ডে মিলতে হবে। মুখের আশ্বাসে অমিল মিটে যায় না।
ভূমি অফিসে যাচাই
খতিয়ান যাচাইয়ের আসল জায়গা ভূমি অফিস। সেখানে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড দেখে মিলিয়ে নেওয়া যায় মালিকের নাম, দাগ নম্বর আর পরিমাণ ঠিক আছে কি না। এছাড়া নামজারি বা মিউটেশনের রেকর্ড দেখে বোঝা যায় সর্বশেষ মালিক হিসেবে কার নাম রেকর্ড করা আছে। দলিলের তথ্যও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।
নিজে অফিসে যাওয়া সম্ভব না হলে, নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করান। আইনজীবী রেকর্ড দেখবেন, ধারাবাহিকতা মেলাবেন, আর অমিল থাকলে সেটা লিখিতভাবে জানাবেন। এই যাচাইয়ের খরচ জমির দামের তুলনায় খুবই কম, কিন্তু এর মূল্য অনেক বেশি।
কেনার আগে যে তালিকাটা সঙ্গে রাখবেন
মৌজা, খতিয়ান নম্বর আর দাগ নম্বর দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না
খতিয়ানে মালিকের নাম আর অংশ বিক্রেতার দাবির সঙ্গে মেলে কি না
সিএস থেকে আরএস, আরএস থেকে বিএস — মালিকানার ধারায় কোনো ব্যাখ্যাহীন ফাঁক আছে কি না
নামজারির রেকর্ডে বিক্রেতার নাম সর্বশেষ মালিক হিসেবে আছে কি না
পরিমাণ, শ্রেণি আর দাগ নিয়ে কোনো অমিল থাকলে তার লিখিত ব্যাখ্যা আছে কি না
জমি কেনা জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। খতিয়ান আর দাগ নম্বর বুঝে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের প্রথম ধাপ। কাগজ মিললে আস্থা বাড়ে, অমিল থাকলে সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকে। তাড়াহুড়ো না করে, সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে, আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে এগোনোই নিরাপদ পথ।
প্রতিদিনের সম্পত্তি, বাজার ও অর্থের খবর পেতে ফেসবুকে Estate News ফলো করুন: https://www.facebook.com/profile.php?id=61593817347872




