পুরোনো ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে অনেকেই প্রথমে দামের দিকে তাকান। নতুন ফ্ল্যাটের চেয়ে দাম কম, এলাকা চেনা, হয়তো স্কুল আর বাজার হাঁটার দূরত্বে। এই হিসাব ঠিক। কিন্তু যে হিসাবটা পরে এসে ধাক্কা দেয়, সেটা সংস্কারের। দেয়ালের রং নতুন করলেই কি বাড়ি বসবাসের উপযোগী হয়? ঢাকার পুরোনো বাড়িগুলোতে উত্তরটা প্রায়ই না।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা পুরান ঢাকার বিশ-ত্রিশ বছরের পুরোনো বাড়িতে প্রথমে চোখ যায় রঙে। অথচ আসল খরচ লুকিয়ে থাকে দেয়ালের ভেতরে। পানির লাইন পুরোনো হলে পাইপে জং ধরে, পানির চাপ কমে যায়। বিদ্যুতের তার পুরোনো হলে এসি আর গিজার একসঙ্গে চললে ব্রেকার পড়ে। বর্ষায় ছাদের পানি চুঁইয়ে দেয়ালে দাগ পড়ে, সেই দাগ রং দিয়ে ঢাকা যায়, কিন্তু ভেতরের স্যাঁতসেঁতে ভাব যায় না। তাই কেনার আগে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বা ঠিকাদারকে দিয়ে বাড়িটা দেখানোই সবচেয়ে কম খরচের সিদ্ধান্ত।

প্রথমে কাঠামো, তারপর সাজসজ্জা

Estate News — Find your dream home

সংস্কারের বাজেট সাজানোর নিয়মটা সহজ: যা না করলে থাকা যাবে না, সেটা আগে। ছাদের ফুটো, মূল পানির লাইন, বৈদ্যুতিক মেইন লাইন, সেপটিক আর ড্রেনেজ লাইন এই তালিকায় সবার ওপরে। এরপর আসে বাথরুম আর রান্নাঘর, কারণ এই দুই জায়গায় পানি আর বিদ্যুৎ একসঙ্গে কাজ করে। সবশেষে রং, টাইলস, দরজা-জানালা আর আসবাব।

ঢাকার একটি সংস্কারকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত হিসাবে মৌলিক সংস্কারে প্রতি বর্গফুটে এক হাজার থেকে এক হাজার আটশো টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যেখানে থাকে রং, ছোটখাটো মেরামত আর মেঝে ঘষা। রান্নাঘর, বাথরুম, আলো আর কাঠের কাজসহ মানসম্মত সংস্কারের হিসাব দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা প্রতি বর্গফুট। পুরো বাড়ি নতুন করে সাজাতে গেলে তিন হাজার থেকে চার হাজার পাঁচশো টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। এগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত অনুমান, কোনো বাড়ির চূড়ান্ত বিল নয়। আপনার বাড়ির অবস্থা, জিনিসপত্রের মান আর এলাকা অনুযায়ী খরচ বাড়বে বা কমবে।

স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর পানির লাইন

বর্ষার ঢাকায় পুরোনো বাড়ির সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। দেয়ালের নিচের দিকে দাগ, রং ফুলে ওঠা, ঘরে সোঁদা গন্ধ, এই লক্ষণগুলো দেখা গেলে প্রথমে উৎস খুঁজতে হবে। ছাদ থেকে পানি আসছে, নাকি পাশের বাথরুমের পাইপ ফুটো, নাকি বাইরের দেয়ালে ফাটল, উত্তর না জেনে রং করলে কয়েক মাসের মধ্যে একই দাগ ফিরে আসে।

পানির লাইন যাচাই করার সহজ উপায় আছে। সব কল একসঙ্গে ছেড়ে দেখুন পানির চাপ কেমন। ছাদের ট্যাংক ভরে রাখার পর নিচের তলায় পানি নামতে কত সময় লাগে, সেটা লক্ষ করুন। পুরোনো গ্যালভানাইজড পাইপ ভেতর থেকে জং ধরে সরু হয়ে যায়, তখন শুধু কল বদলালে কাজ হয় না, লাইন বদলাতে হয়।

বিদ্যুৎ আর গ্যাসের লাইন

Advertise on Estate News

পুরোনো বাড়ির বিদ্যুতের লাইন নিয়ে আপস চলে না। তারের বয়স বেশি হলে, সুইচবোর্ডে পোড়া দাগ থাকলে বা ঘন ঘন ফিউজ গেলে একজন লাইসেন্সধারী ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে পুরো লাইন পরীক্ষা করান। নতুন এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন আর গিজারের চাপ পুরোনো তারের পক্ষে বেশি হতে পারে। মিটার থেকে মূল বোর্ড পর্যন্ত লাইন ঠিক আছে কি না, আর্থিং আছে কি না, এগুলো জানার পরই বাজেট চূড়ান্ত করুন।

গ্যাসের লাইনের ক্ষেত্রে নিজে হাত দেবেন না। লাইনে লিক আছে কি না, চুলার সংযোগ বৈধ কি না, এগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করাতে হয়।

বাজেটে জায়গা রাখুন অজানা খরচের জন্য

পুরোনো বাড়িতে কাজ শুরু করলে নতুন সমস্যা বের হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেয়াল ভাঙলে ভেতরে নষ্ট পাইপ দেখা যায়, মেঝে তুললে নিচে পানি জমার চিহ্ন মেলে। এই কারণে অভিজ্ঞ ঠিকাদাররা মোট বাজেটের দশ থেকে বিশ শতাংশ আলাদা করে রাখার পরামর্শ দেন, যেন মাঝপথে কাজ থেমে না যায়। এই টাকাটা খরচ না হলে পরে আসবাব বা পর্দায় কাজে লাগবে।

খরচ কমানোর কিছু বাস্তব উপায় আছে। ভালো অবস্থায় থাকা দরজা, জানালা বা টাইলস রেখে দিন। মিরপুর বা ধানমন্ডির স্থানীয় দোকান থেকে জিনিস কিনলে অনেক সময় দাম কমে। কিন্তু পাইপ, তার আর সিমেন্টের মতো লুকানো জিনিসে সস্তা খুঁজতে যাবেন না। সেগুলোতেই দুর্ঘটনা আর বারবার মেরামতের খরচ লুকিয়ে থাকে।

কেনার আগে যাচাইয়ের তালিকা

দলিল আর অনুমোদনের কাগজপত্র ঠিক আছে কি না, ভবনের অনুমোদন আছে কি না, বকেয়া সার্ভিস চার্জ আছে কি না, এগুলো কেনার আগেই জানতে হবে। পাশাপাশি বাড়ির মালিক সমিতি থাকলে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। লিফট, জেনারেটর আর পানির পাম্পের অবস্থা কেমন, মাসে কত টাকা সার্ভিস চার্জ যায়, এই তথ্যগুলো আপনার মাসিক খরচের হিসাব বদলে দেবে।

পুরোনো বাড়ি খারাপ সিদ্ধান্ত নয়। অনেক পুরোনো বাড়ির কাঠামোই নতুন অনেক ভবনের চেয়ে মজবুত। পার্থক্য তৈরি করে যাচাই আর বাজেট। দেয়ালের ভেতরের কাজ আগে, রঙের কাজ পরে, এই নিয়ম মেনে চললে পুরোনো ফ্ল্যাটও অনেক বছর আরামে থাকার মতো বাড়ি হয়ে ওঠে।