ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখেন অনেক পরিবার। কিন্তু স্বপ্নের সামনে দাঁড়ায় একটা সংখ্যা, সুদের হার। ব্যাংকে গিয়ে জানতে চাইলে এক ব্যাংক এক হার বলে, আরেক ব্যাংক বলে আরেকটা। কোনো ব্যাংক কম হারের কথা বলে প্রসেসিং ফি বেশি নেয়, কোনো ব্যাংক হার কম দেখিয়ে পরে বাড়িয়ে দেয়। সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটা সংখ্যা দেখে নেওয়া যায় না। পুরো শর্তটা বুঝে নিতে হয়।

প্রথমে বাজারের অবস্থাটা জেনে নেওয়া ভালো। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ কঠোর করায় গত দুই বছরে গৃহঋণের সুদ প্রায় ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে, যা ধীরে ধীরে ঋণের হার কমাতে পারে। তবু এখনো দুই অঙ্কের সুদই স্বাভাবিক। প্রকাশিত এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ব্যাংকভেদে গৃহঋণের হার এখন মোটামুটি ৯ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, আর বেশির ভাগ হারই পরিবর্তনশীল।

কমানো ব্যালান্স বুঝে নিন

Estate News — Find your dream home

সুদের হিসাবটা কীভাবে হয়, সেটাই আসল প্রশ্ন। বেশির ভাগ ব্যাংক এখন কমানো ব্যালান্স বা রিডিউসিং ব্যালান্স পদ্ধতিতে সুদ ধরে। এর মানে, প্রতি মাসে কিস্তি দেওয়ার পর বাকি ঋণের ওপর সুদ হিসাব হয়। ঋণ কমতে থাকলে সুদের অঙ্কও কমে। এটাই স্বচ্ছ পদ্ধতি।

তবে কিছু ঋণে ফ্ল্যাট রেট বা সমান হারের হিসাব থাকে, যেখানে শুরুর পুরো অঙ্কের ওপর সুদ ধরা হয়। এমন হিসাবে মাসিক কিস্তি কম মনে হতে পারে, কিন্তু মোট সুদ অনেক বেশি হয়। ঋণ নেওয়ার আগে লিখিতভাবে জানতে চান, সুদ কি কমানো ব্যালান্সে ধরা হচ্ছে। মুখের কথায় নয়, লিখিত শর্তপত্রেই উত্তরটা থাকতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো স্থির আর পরিবর্তনশীল হারের পার্থক্য। স্থির হারে পুরো মেয়াদে হার এক থাকে। পরিবর্তনশীল হারে ব্যাংক বাজারের অবস্থা অনুযায়ী হার বাড়াতে বা কমাতে পারে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ গৃহঋণ পরিবর্তনশীল হারে হয়। তাই আজকের হারটাই শেষ কথা নয়। হার বাড়লে মাসিক কিস্তি কত বাড়বে, সেই হিসাবটাও আগে করে নিন।

হার ছাড়া আর যা যা মেলাবেন

Estate News free property calculators

সুদের হার ছাড়া আরও কয়েকটি খরচ আছে। প্রসেসিং ফি, মূল্যায়ন ফি আর বাধ্যতামূলক বীমা মিলিয়ে ঋণের আসল খরচ বেড়ে যায়। কোনো ব্যাংক কম সুদ দেখিয়ে বেশি ফি নিতে পারে। তাই তুলনা করার সময় শুধু হার নয়, মোট খরচ দেখুন। একটি ঋণে ৭০ লাখ টাকা ১১ শতাংশ হারে ২০ বছরের জন্য নিলে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় প্রায় ৭২ হাজার ৩০০ টাকা, আর মোট সুদ প্রায় ১ কোটি টাকার বেশি হয়, প্রকাশিত এক হিসাবে বলা হয়েছে। মেয়াদ বাড়ালে কিস্তি কমে, কিন্তু মোট সুদ বাড়ে।

আগাম পরিশোধের শর্তটাও দেখে নিন। অনেক ব্যাংক এখন আগাম পরিশোধে বড় জরিমানা নেয় না। তবে শর্তপত্রে কী লেখা আছে, সেটা পড়ে নেওয়া দরকার। ভবিষ্যতে বেতন বাড়লে বা বাড়তি টাকা হাতে এলে ঋণ আগেভাগে শোধ করতে পারলে সুদ অনেক কমে। সেই সুযোগটা যেন শর্তে আটকে না যায়।

বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ঋণ একটা আলাদা বিকল্প। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে ঋণ দেয়, আর মেয়াদ ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। প্রক্রিয়াটা ধীর হতে পারে, কিন্তু সুদ বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে কম। নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী এই বিকল্পটাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

কত টাকা ঋণ পাবেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে ব্যাংক সাধারণত ফ্ল্যাটের দামের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়, বাকি ৩০ শতাংশ নিজের টাকা দিতে হয়। এক কোটি টাকার ফ্ল্যাটে এর মানে ৩০ লাখ টাকা নিজের। এ ছাড়া ব্যাংকভেদে ঋণের সীমাও আলাদা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের গৃহঋণে খেলাপির হার ৫ শতাংশের কম, তারা একজনকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে পারে। খেলাপি বেশি হলে সীমা ৩ কোটি বা ২ কোটি টাকায় নেমে আসে।

সম্প্রতি রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যক্তিগত গৃহঋণে ৫ শতাংশ সুদের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে ডেইলি সান জানিয়েছে। এটি একটি প্রস্তাব, কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নয়। তাই ঋণের পরিকল্পনা আজকের বাস্তব হার ধরেই করুন।

শেষ কথা একটাই। তিনটি ব্যাংকের লিখিত প্রস্তাব পাশাপাশি রাখুন। হার, ফি, মেয়াদ, আগাম পরিশোধের শর্ত আর মাসিক কিস্তি, সব এক টেবিলে মিলিয়ে দেখুন। যে ব্যাংক সবচেয়ে কম হারের কথা বলে, সেটাই সবচেয়ে সস্তা ঋণ নয়। সবচেয়ে সস্তা ঋণ সেটাই, যার মোট খরচ সবচেয়ে কম, আর যার শর্তে কোনো লুকানো ফাঁদ নেই।