কুমিল্লা শহরে সন্ধ্যা নামলে কান্দিরপাড়ের মোড়ে ভিড় জমে। দোকানপাটে বাতি জ্বলে, রিকশার ঘণ্টা বাজে, আর নতুন ভবনগুলোর জানালায় আলো জ্বলতে থাকে একটার পর একটা। দশ বছর আগেও এই দৃশ্য এমন ছিল না। তখন শহরের আবাসন মানেই ছিল নিচু বাড়ি আর ছড়িয়ে থাকা ভবন। এখন মাঝারি ও উঁচু ভবন উঠছে, ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে, আর অনেক পরিবার এখানেই স্থায়ী ঠিকানা খুঁজছে।

পরিবর্তনের পেছনে আছে যোগাযোগ। ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন হওয়ার পর শহরের বিস্তার বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আর বাইপাস সড়ক শহরটিকে দেশের দুই বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) নতুন কর্মসংস্থান এনেছে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সুবিধাগুলোই শহরে আবাসনের চাহিদা বাড়িয়েছে।

কারা কিনছেন, কোথায় কিনছেন

Estate News — Find your dream home

কুমিল্লায় ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের বড় অংশই প্রবাসী পরিবার আর বিভিন্ন পেশার মানুষ। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের ভালো স্কুল-কলেজের পরিবেশের কারণে অনেক প্রবাসী চান তাদের পরিবার ও সন্তান এখানে থাকুক, পড়াশোনা করুক। চাহিদা বেশি ঝাউতলা, বাগিচাগাঁও, বাদুরতলা, তালপুকুরপাড় আর নানুয়া দিঘি ও রানীর দিঘির আশপাশে।

স্থানীয় ডেভেলপারদের পাশাপাশি ঢাকার কোম্পানিও এখানে প্রকল্প করছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে নন্দী রিয়েল এস্টেট, এমআরসি বিল্ডার্স ও গোল্ড সিলভার হোমসের মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কথা আছে। আছে এসইএল আর বিটিআইয়ের মতো ঢাকাভিত্তিক কোম্পানির প্রকল্পের কথাও। চাহিদা শুধু শহরের ভেতর থেকে আসছে না। চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, নোয়াখালী আর ফেনী থেকেও মানুষ কুমিল্লায় ভালো শিক্ষা ও জীবনযাপনের সুবিধা খুঁজে আসছে।

প্রবাসের টাকায় গড়ে ওঠা শহর

কুমিল্লার আবাসন বাজারে প্রবাসীদের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহে কুমিল্লা জেলা দেশে তৃতীয়, আর প্রবাসীর সংখ্যায় প্রথম। গত দুই দশকে জেলা থেকে ১২ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি মানুষ কাজের জন্য বিদেশে গেছেন।

Advertise on Estate News

সেই টাকায় গ্রামে যেমন পাকা বাড়ি উঠছে, শহরেও তেমনি ফ্ল্যাট কিনছেন প্রবাসী পরিবার। প্রতিবেদনে একটি আবাসন কোম্পানির হিসাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে তাদের ৩৮টি প্রকল্পের মধ্যে ২৭টি নির্মাণাধীন, আর ক্রেতাদের বেশির ভাগই প্রবাসী। কুমিল্লা রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ৪০টি ডেভেলপার কোম্পানি ২০টি আবাসিক এলাকায় ৫০০টির বেশি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। শহরে এখন পাঁচ হাজারের বেশি উঁচু ও নিচু ভবন আছে, যার মধ্যে ৩০০টির বেশি দশ তলার ওপরে। ফ্ল্যাট ক্রেতাদের প্রায় ৭০ শতাংশই প্রবাসী পরিবার, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দাম কত, আর কী দেখে কিনবেন

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফ্ল্যাটের দাম এখন প্রতি বর্গফুটে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে, যা নির্ভর করে অবস্থান, ভবনের মান আর সুবিধার ওপর। ভালো কাজ আর সময়মতো হস্তান্তরের জন্য ক্রেতারা দুই থেকে পাঁচ লাখ, এমনকি দশ লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে রাজি হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। জমির দামও বেড়েছে। এক আবাসন কোম্পানির তথ্যে বলা হয়েছে, শহরে জমির গড় দাম শতাংশপ্রতি ৪০ লাখ টাকা।

তবে দামই সব নয়। কুমিল্লায় ফ্ল্যাট কেনার আগে কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে নেওয়া দরকার। প্রকল্পের অনুমোদন আছে কি না, ডেভেলপার এর আগে কয়টি প্রকল্প সময়মতো হস্তান্তর করেছে, ভবনের নির্মাণসামগ্রীর মান কেমন, আর গ্যাস-পানির সংযোগের অবস্থা কী, এসব প্রশ্নের উত্তর লিখিতভাবে নিন। মহাসড়কের কাছাকাছি প্রকল্পে যাতায়াত সুবিধা বেশি, কিন্তু শব্দ আর ধুলোর বিষয়টিও মাথায় রাখুন।

রেলপথের সুবিধাও আছে। কুমিল্লা রেলস্টেশন থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলে, আর মহাসড়কে বাস চলাচল সারাদিন থাকে। যারা ঢাকায় চাকরি করেন কিন্তু পরিবার কুমিল্লায় রাখতে চান, তাদের জন্য এই যোগাযোগটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। সপ্তাহে এক-দুবার যাতায়াত করে ঢাকার চাকরি আর কুমিল্লার সংসার, দুটোই চালানো যায়।

কুমিল্লার গল্পটা আসলে বাংলাদেশের অনেক জেলা শহরের গল্প। মানুষ কাজের জন্য ঢাকায় যায়, টাকা পাঠায় বাড়িতে, আর পরিবার থাকে জেলা শহরে, যেখানে স্কুল ভালো, খরচ কম, আর নিজের ঠিকানা আছে। সেই ঠিকানা এখন আর একতলা বাড়ি নয়। সেটা এখন বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট, যার জানালা দিয়ে গোমতীর হাওয়া আসে, আর যার ঠিকানা লেখা থাকে কান্দিরপাড়ের পোস্ট অফিসে।