দশ বছর আগেও জমি বা ফ্ল্যাট কেনার খোঁজ শুরু হতো এলাকার দালালের কাছে গিয়ে। এখন শুরু হয় মোবাইলের স্ক্রিনে। ছবি দেখা যায়, দাম জানা যায়, লোকেশন ম্যাপে মেলানো যায়, ডেভেলপারের আগের প্রকল্পের খোঁজ নেওয়া যায়। প্রবাসে থাকা ক্রেতার জন্য এই পরিবর্তনটা সবচেয়ে বড়। লন্ডন বা দুবাইয়ে বসে ঢাকার ফ্ল্যাটের খোঁজ নেওয়া এখন আর অসম্ভব নয়।
কিন্তু সুবিধার সঙ্গে ঝুঁকিও এসেছে। অনলাইনে ছবি আর বাস্তবের ফ্ল্যাট এক নাও হতে পারে। একই ছবি দিয়ে একাধিক বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে বুকিংয়ের টাকা চাওয়া হয়। তাই ডিজিটাল পথে কেনার প্রথম নিয়ম, যা দেখা যাচ্ছে তা যাচাই করা।
যাচাই শুরু হয় কাগজ দিয়ে
জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হয় খতিয়ান। জমির মালিক কে, জমির পরিমাণ কত, কোনো দাগে মামলা বা বিরোধ আছে কি না, এসব খতিয়ান থেকেই বোঝা যায়। এরপর দেখতে হয় দলিলের ধারাবাহিকতা। জমি কয় হাত বদলেছে, প্রতিটি হাতবদলের দলিল ঠিক আছে কি না, সেটা মেলানো জরুরি। নামজারি হয়েছে কি না, খাজনা হালনাগাদ আছে কি না, এগুলোও দেখে নিতে হয়।
ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে দেখতে হয় রাজউকের অনুমোদন। ভবনের নকশা অনুমোদিত কি না, অনুমোদনের সঙ্গে নির্মাণ মিলছে কি না, ডেভেলপারের আগের প্রকল্প সময়মতো হস্তান্তর হয়েছে কি না। অনলাইনে এসব তথ্যের একাংশ পাওয়া যায়, বাকিটা দেখতে হয় সরাসরি। যিনি বিদেশে থাকেন, তিনি পরিবারের বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে সরাসরি যাচাই করিয়ে নিলে ঝুঁকি কমে।
অনলাইনে যাচাইয়ের একটা সুবিধা, তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট, কথোপকথনের রেকর্ড, দামের লিখিত বিবরণ, সব জমিয়ে রাখা যায়। পরে কোনো বিরোধ হলে এই রেকর্ড কাজে আসে। মুখের কথায় কেনাবেচা না করে, প্রতিটি ধাপ লিখিত রাখাই নিরাপদ।
টাকার লেনদেনে ব্যাংকই নিরাপদ পথ
জমি বা ফ্ল্যাটের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংক ছাড়া অন্য পথ ঝুঁকিপূর্ণ। বুকিং মানি, কিস্তি, রেজিস্ট্রেশন খরচ, সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হলে তার রেকর্ড থাকে। নগদ টাকা দিলে সেই রেকর্ড থাকে না, আর বিরোধ হলে প্রমাণ করা কঠিন হয়।
প্রবাসী ক্রেতাদের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো আরও জরুরি। বৈধ পথে পাঠানো টাকার রেকর্ড থাকে, আর সেই রেকর্ড পরে রেজিস্ট্রেশনের সময় কাজে আসে। অচেনা কারও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, বা কারও হাতে নগদ টাকা দেওয়া, দুটোই এড়িয়ে চলা উচিত।
অনলাইন পেমেন্টের ক্ষেত্রে আরও একটা সতর্কতা দরকার। ব্যাংক বা ডেভেলপারের নামে আসা মেসেজ বা লিংকে ক্লিক করে পেমেন্ট করা নিরাপদ নয়। পেমেন্ট করার আগে নম্বর আর অ্যাকাউন্টের নাম যাচাই করে নেওয়া উচিত। অচেনা নম্বর থেকে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চাওয়া হলে সেটা কখনোই দেওয়া যাবে না।
প্রতারণার লক্ষণগুলো চেনা
কিছু লক্ষণ দেখলে থামতে হয়। দাম বাজারের চেয়ে অনেক কম। তাড়াহুড়ো করে বুকিং দিতে বলা। কাগজ দেখাতে অনীহা। শুধু হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলা, অফিসের ঠিকানা না দেওয়া। এগুলোর যেকোনো একটা দেখা দিলেই আরও যাচাই দরকার।
আরেকটা লক্ষণ, একই ফ্ল্যাট একাধিকজনের কাছে বিক্রির প্রস্তাব। ডেভেলপারের আগের প্রকল্পের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে এই ধরনের সমস্যার খবর পাওয়া যায়। ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা, আশপাশের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করা, এসব পুরনো পদ্ধতি অনলাইনের যুগেও কাজ করে।
ডিজিটাল সুবিধা, পুরনো সতর্কতা
ডিজিটাল যুগে জমি-ফ্ল্যাট কেনা সহজ হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। খোঁজ নেওয়া যায় ঘরে বসে, টাকা পাঠানো যায় ব্যাংকের মাধ্যমে, কাগজের ছবি পাঠানো যায় মুহূর্তে। কিন্তু কেনার সিদ্ধান্ত এখনও পুরনো নিয়মেই নিতে হয়। কাগজ যাচাই, সরাসরি দেখা, লিখিত চুক্তি, ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন। এই চারটি নিয়ম মানলে অনলাইনের সুবিধা নেওয়া যায়, আর প্রতারণার ঝুঁকিও কমে।
প্রবাসী ক্রেতার জন্য বাড়তি সতর্কতা
বিদেশে থেকে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ক্রেতা নিজে উপস্থিত থাকেন না, তাই কাগজ দেখা আর সরাসরি যাচাইয়ের দায়িত্ব পড়ে পরিবারের কারও ওপর। এই ক্ষেত্রে যাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তিনি যেন বিশ্বস্ত হন, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। সম্ভব হলে নিজে দেশে এসে একবার জমি বা ফ্ল্যাট দেখে যাওয়া ভালো।
টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা। ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধ পথে টাকা পাঠালে তার রেকর্ড থাকে, আর সেই রেকর্ড রেজিস্ট্রেশনের সময় কাজে আসে। কোনো এজেন্ট বা দালালের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা না পাঠিয়ে সরাসরি ডেভেলপারের বা বিক্রেতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন করাই নিরাপদ। লেনদেনের প্রতিটি ধাপের রসিদ সংরক্ষণ করা উচিত।


