ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে এখন সন্ধ্যার পর দরজায় কড়া নাড়লে প্রথমে প্রশ্ন আসে, কে এসেছে। উত্তরটা জানার জন্য অনেক বাড়িতে আর দরজা খুলতে হয় না। ছোট একটি ক্যামেরা, একটি ইন্টারকম আর দরজার একটি স্মার্ট লক মিলে সেই কাজটা করে দেয়। যন্ত্রগুলো দামে আগের চেয়ে সহজলভ্য হয়েছে। কিন্তু বসানোর আগে কয়েকটা বিষয় না জানলে পরে ভোগান্তি হয়।
সিসিটিভি দিয়ে শুরু করা যাক। ফ্ল্যাটের মূল দরজা, সিঁড়ির মুখ আর পার্কিংয়ের দিকে ক্যামেরা থাকলে সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। কেনার আগে দেখতে হবে রাতের ছবি কেমন আসে। দিনের আলোয় সব ক্যামেরাই ভালো ছবি দেয়। রাতের ছবি ঘোলা হলে সেই ক্যামেরার কোনো মূল্য নেই। আরেকটি বিষয় হলো সংরক্ষণ। ছবি কোথায় জমা হবে, মেমোরি কার্ডে নাকি বাড়ির একটি রেকর্ডারে, সেটা জেনে নিতে হবে। কার্ড নষ্ট হলে বা চুরি গেলে পুরোনো ফুটেজ আর ফেরত পাওয়া যায় না।
বিদ্যুৎ গেলে ক্যামেরা কী করবে, সেটাও প্রশ্ন। ঢাকায় লোডশেডিং এখনো নিয়মিত ঘটনা। অনেক বাড়িতে আইপিএস আছে, কিন্তু ক্যামেরার লাইন আইপিএসের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা অনেকেই যাচাই করেন না। বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেলে নিরাপত্তার সবচেয়ে দুর্বল সময়টাতেই চোখ বন্ধ থাকে। কেনার সময় বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন, বিদ্যুৎ না থাকলে ক্যামেরা কতক্ষণ চলবে।
ইন্টারকম: গেট থেকে ফ্ল্যাট পর্যন্ত
ইন্টারকমের কাজ সহজ। নিচের গেট থেকে কেউ এলে ফ্ল্যাট থেকে কথা বলে পরিচয় জেনে নেওয়া যায়। ভিডিও ইন্টারকমে ছবিও দেখা যায়। পুরোনো বাড়িতে তার টেনে ইন্টারকম বসানো কঠিন হতে পারে। নতুন অনেক যন্ত্রে তারের বদলে ওয়াইফাই ব্যবহার হয়। তবে ফ্ল্যাটের ওয়াইফাই দুর্বল হলে ভিডিও আটকে যায়। কেনার আগে নিজের ফ্ল্যাটে ওয়াইফাইয়ের সংকেত কেমন, তা দেখে নেওয়া উচিত।
আরেকটি বিষয় হলো বাড়ির নিয়ম। কোনো কোনো বাড়িতে দরজার বাইরে যন্ত্র বসাতে হাউজিং কমিটির অনুমতি লাগে। নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে যন্ত্র বসানো নিয়ে সাধারণত সমস্যা হয় না। কিন্তু বারান্দা বা সিঁড়ির মতো ভাগ করা জায়গায় ক্যামেরা বসাতে গেলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভালো। ক্যামেরা যেন প্রতিবেশীর দরজা বা জানালার দিকে সরাসরি তাকিয়ে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
স্মার্ট লক: চাবি ছাড়া দরজা
স্মার্ট লকে চাবির বদলে আঙুলের ছাপ, পিন নম্বর বা মোবাইল ফোন ব্যবহার হয়। পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা পিন দেওয়া যায়। কাজের লোক বা ভাড়াটে চলে গেলে পিন বদলে নেওয়া যায়, তালা বদলাতে হয় না। এটাই এর বড় সুবিধা।
তবে দুটি দুর্বলতা আছে। একটি হলো ব্যাটারি। স্মার্ট লক ব্যাটারিতে চলে। ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে দরজা খোলা যায় না। ভালো লক ব্যাটারি কমে গেলে আগেই সংকেত দেয়। তবু বাড়িতে একটি সাধারণ চাবি রাখা উচিত, যাতে জরুরি সময়ে দরজা খোলা যায়। দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো দরজার সঙ্গে মানানসই হওয়া। সব স্মার্ট লক সব দরজায় বসে না। পুরোনো কাঠের দরজা বা পাতলা স্টিলের দরজায় বসাতে গেলে বাড়তি কাজ লাগতে পারে। দরজার পুরুত্ব আর তালার ধরন মেপে তারপর কিনুন।
পরিবারের সবাইকে জানিয়ে রাখুন
যন্ত্র বসানোর পর বাড়ির সবাইকে তা ব্যবহার করতে শেখাতে হবে। বয়স্ক বাবা-মা বা শিশুরা যেন দরজা খুলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করুন। পিন নম্বর কাগজে লিখে দরজার পাশে লাগিয়ে রাখবেন না। বরং পরিবারের সদস্যদের আলাদা পিন দিন, যাতে কে কখন ঢুকেছে তা বোঝা যায়। কাজের লোক বা ডেলিভারি কর্মী এলে দরজা খুলে দেওয়ার দায়িত্ব কার, সেটা আগেই ঠিক করে রাখুন। যন্ত্রের যত্নও পরিবারের কাজ। মাসে একবার ক্যামেরার লেন্স মুছে নিন, ব্যাটারি পরীক্ষা করুন, অ্যাপের আপডেট আছে কি না দেখুন। ছোট এই যত্নটুকু না নিলে একদিন দেখবেন যন্ত্র আছে, কিন্তু কাজ করছে না।
কেনার আগে যে যাচাইগুলো করবেন
প্রথমে দেখুন, যন্ত্রের ওয়ারেন্টি কতদিনের আর ঢাকায় সার্ভিস দেওয়ার লোক আছে কি না। বিদেশি ব্র্যান্ডের যন্ত্রে অনেক সময় ঢাকায় সার্ভিস পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ক্যামেরা বা লকের অ্যাপে নিজের তথ্য কোথায় যায়, তা জিজ্ঞেস করুন। পাসওয়ার্ড বদলে নিন আর দুই ধাপের যাচাই চালু করুন। তৃতীয়ত, বাড়ির দারোয়ান বা কেয়ারটেকারকে জানিয়ে রাখুন। যন্ত্র বসানোর পর তিনিই প্রথমে তা ব্যবহার করবেন।
স্মার্ট যন্ত্র নিরাপত্তা বাড়ায়, কিন্তু নিজে থেকে নিরাপত্তা দেয় না। ক্যামেরা বসিয়ে দরজা খোলা রাখলে কোনো লাভ নেই। ভালো তালা, সতর্ক প্রতিবেশী আর নিয়মিত যাচাই, এই তিনটি মিলেই ফ্ল্যাট নিরাপদ থাকে। যন্ত্র শুধু সেই কাজটাকে সহজ করে দেয়।




