ঢাকার ছোট ফ্ল্যাটে জায়গার অভাব একটি পরিচিত অভিযোগ। তার মধ্যেও অনেক পরিবার বারান্দায় বা জানালার পাশে দু-চারটি গাছ রাখতে চান। কারণটা শুধু সাজসজ্জা নয়, সবুজ দেখলে ঘরটা একটু জীবন্ত মনে হয়, বারান্দাটা ব্যবহারের জায়গা হয়ে ওঠে, আর সকালের চা খাওয়ার সময়টা একটু ভালো লাগে।
তবে গাছ রাখা আর গাছ টিকিয়ে রাখা এক কথা নয়। অনেকেই উৎসাহ নিয়ে গাছ কেনেন, তারপর আলো বা পানির ভুলে গাছ মরে যায়, আর মনে হয়, আমার হাতে গাছ বাঁচে না। আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা হাতের নয়, হিসাবের। আলো, পানি আর জায়গা, এই তিনটি ঠিক থাকলে ছোট ফ্ল্যাটেও গাছ ভালো থাকে।
প্রথমে আলো দেখুন, তারপর গাছ কিনুন
গাছ কেনার আগে দেখুন, আপনার ফ্ল্যাটে আলো কেমন আসে। দক্ষিণ বা পূর্বমুখী বারান্দায় সরাসরি রোদ আসে, উত্তরমুখী বারান্দায় আলো থাকে কিন্তু রোদ কম। ঘরের ভেতরে জানালার পাশে আলো আসে, কিন্তু ঘরের মাঝখানে আলো অনেক কম।
সাধারণ নিয়ম হলো, যে গাছের যত আলো দরকার, তাকে তত আলোর জায়গায় রাখুন। সরাসরি কড়া রোদ সব গাছের জন্য ভালো নয়; অনেক ইনডোর গাছ উজ্জ্বল কিন্তু পরোক্ষ আলো পছন্দ করে। আবার একেবারে অন্ধকার কোণে কোনো গাছই ভালো থাকে না। তাই কেনার সময় বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন, এই গাছটি কেমন আলো চায়, আর আপনার ফ্ল্যাটের আলোর সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখুন।
একটি সহজ পরীক্ষা আছে। দিনের বেলায় গাছ রাখার জায়গায় হাত রাখুন। যদি ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়, তবে সেখানে উজ্জ্বল আলো আছে। যদি ছায়া ঝাপসা হয়, তবে আলো মাঝারি। আর যদি প্রায় ছায়াই না পড়ে, তবে সেখানে আলো কম, সেখানে শুধু কম আলোতে টিকে থাকা গাছই রাখা উচিত।
পানি: কম দেওয়াই বেশির ভাগ সময় নিরাপদ
ইনডোর গাছ মরার সবচেয়ে সাধারণ কারণ অতিরিক্ত পানি। মাটি সব সময় ভেজা থাকলে শিকড় পচে যায়। তাই পানি দেওয়ার আগে আঙুল দিয়ে মাটি পরীক্ষা করুন, ওপরের এক-দুই ইঞ্চি মাটি শুকনো মনে হলে তবেই পানি দিন।
টবের নিচে ছিদ্র থাকা জরুরি, যাতে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে। ছিদ্র ছাড়া সুন্দর পাত্রে গাছ রাখতে চাইলে, ভেতরে ছিদ্রযুক্ত টব বসিয়ে বাইরের পাত্রটি কভার হিসেবে ব্যবহার করুন।
ঋতু অনুযায়ী পানির পরিমাণ বদলায়। গরমে মাটি দ্রুত শোকে, শীতে ধীরে। তাই সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে পানি দেওয়ার নিয়ম না করে, মাটি দেখে পানি দেওয়ার অভ্যাস করাই ভালো।
বারান্দা, জানালা আর ছাদ: জায়গা অনুযায়ী পরিকল্পনা
ছোট ফ্ল্যাটে গাছ রাখার জায়গা বাছাই করাই আসল বুদ্ধি।
বারান্দা: বারান্দা সবচেয়ে ভালো জায়গা, যদি রোদ ও বৃষ্টি থেকে গাছকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া যায়। রেলিংয়ে ঝুলন্ত টব, দেয়ালে তাক, আর মেঝেতে বড় টব, এই তিনটি মিলিয়ে বারান্দায় অনেক গাছ রাখা যায়, হাঁটার জায়গা না কমিয়ে।
জানালার পাশ: জানালার পাশের তাক বা টেবিলে ছোট গাছ ভালো থাকে। তবে জানালা দিয়ে আসা গরম হাওয়া বা ঠান্ডা হাওয়ার দিকে খেয়াল রাখুন।
ছাদ: ছাদে গাছ রাখতে চাইলে প্রথমে দেখুন, ছাদের ব্যবহার নিয়ে ভবনের নিয়ম কী, আর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কেমন। ছাদে গাছ রাখলে নিয়মিত যত্ন আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বয়, দুটোই দরকার।
কম যত্নের গাছ দিয়ে শুরু করুন
যারা প্রথমবার গাছ রাখছেন, তাঁদের জন্য কম যত্নের গাছ দিয়ে শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণভাবে, যেসব গাছ কম পানিতে টিকে থাকে, মাঝারি আলোতে ভালো থাকে আর ধীরে বাড়ে, সেগুলো নতুনদের জন্য সহজ। স্থানীয় নার্সারিতে গিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের আলো ও জায়গার কথা জানিয়ে পরামর্শ নিন, বিক্রেতার অভিজ্ঞতা এখানে বইয়ের চেয়ে বেশি কাজে লাগতে পারে।
শুরুতে দু-তিনটি গাছই যথেষ্ট। সেগুলো টিকিয়ে রাখতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে, আর তখন ধীরে ধীরে সংগ্রহ বাড়ানো যাবে। একসঙ্গে অনেক গাছ কিনে যত্ন করতে না পারা, এটাই নতুনদের সবচেয়ে সাধারণ ভুল।
বাজেটে সাজানো: টব আর সাজসজ্জা
গাছ সাজাতে বড় খরচের দরকার নেই। মাটির টব, সিরামিকের টব, এমনকি পুরোনো পাত্রে ছিদ্র করে ব্যবহার করা যায়। টবের রং ও আকারে কিছুটা মিল রাখলে দেখতে পরিপাটি লাগে।
একটি পরামর্শ, গাছের উচ্চতা ও পাতার ধরনে বৈচিত্র্য রাখুন। একটি লম্বা গাছ, একটি ঝুলন্ত ধরনের গাছ, আর একটি ছোট টেবিল গাছ, এই তিনটি মিলিয়েই একটি কোণ সুন্দর দেখায়। আর গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো মাঝে মাঝে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিলে গাছ যেমন ভালো থাকে, দেখতেও তেমন সতেজ লাগে।
ছোট ফ্ল্যাটে গাছ রাখা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা দৈনন্দিন জীবনের একটি ছোট আনন্দ। আলো দেখে গাছ বাছুন, মাটি দেখে পানি দিন, আর জায়গা অনুযায়ী সাজান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বুঝতে পারবেন, বারান্দার সবুজটুকু ঘরের মেজাজটাই বদলে দিয়েছে।


