ঢাকার অনেক পরিবারের কাছেই এখন বিদ্যুৎ বিল একটা বড় চিন্তা। গরমে এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প আর আলো মিলে বিল বেড়ে যায়। এই অবস্থায় ছাদের সোলার প্যানেলের কথা শুনলে মনে হয়, একবার বসালেই বিলের চিন্তা শেষ। বাস্তবতা একটু ধীর, তবে আশার কথা হলো, সরকারের নতুন প্রণোদনা আর সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি মিলে হিসাবটা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।

সরকারের নতুন প্রণোদনা: ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা

২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া সরকারের বিশেষ প্রণোদনায় ব্যাটারিসহ ছাদে সোলার বসিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিলে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে ব্যাটারিসহ সোলার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা, তার সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা আর ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে এই দর ঠিক করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে জানানো হয়, গ্রিড বিদ্যুতের গড় খুচরা দাম এখন ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৪০ পয়সা।

Estate News — Find your dream home

তবে এই সুবিধার দুটি শর্ত মনে রাখতে হবে। প্রথমত, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিস্টেম বসাতে হবে, এবং এই দর মিলবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, তিন বছরের জন্য। এর পরে বসানো সিস্টেম এই প্রণোদনা পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার আর মিটারকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নির্ধারিত মান মানতে হবে। টাকা দেওয়া হবে ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে, নগদে নয়।

খরচ কত, ফেরত আসতে কতদিন

খরচের হিসাব সিস্টেমের ধরনের ওপর নির্ভর করে। অনলাইন সোলার হিসাবযন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী, ব্যাটারি ছাড়া ৫ কিলোওয়াটের অন-গ্রিড সিস্টেমের খরচ প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হতে পারে। আর ১৫ থেকে ২০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারিসহ ১০ কিলোওয়াটের হাইব্রিড সিস্টেমের খরচ প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এগুলো সরকারি দর নয়, বাজারভিত্তিক ধারণা — কেনার আগে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের লিখিত মূল্য যাচাই করা উচিত।

একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে, ৫ কিলোওয়াটের সিস্টেম বছরে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিতে পারে, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা হতে পারে। সেই হিসাবে খরচ উঠতে সাত থেকে আট বছর লাগতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, বর্ষায় উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি কমে যায়, ধুলো জমলে প্যানেলের কার্যকারিতা কমে, আর সোলারের কারণে বিলের স্ল্যাব নিচে নেমে গেলে পরের প্রতিটি ইউনিটের সাশ্রয়ও কমে যায়। রোদেলা দিনের হিসাব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়, বার্ষিক গড় হিসাবই আসল।

ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব সীমা হলো ছাদ। ঢাকার বেশির ভাগ অ্যাপার্টমেন্টে ছাদ সবার যৌথ সম্পত্তি, সেখানে একা প্যানেল বসানো যায় না। ভবন কমিটির অনুমতি, ছাদের ভার বহনের ক্ষমতা, পানির ট্যাংক আর সিঁড়িঘরের জায়গা — সবকিছু আগেই মেলাতে হবে। একক বাড়ি বা ডুপ্লেক্সের মালিকের জন্য সিদ্ধান্তটা সহজ, ফ্ল্যাটের জন্য তা যৌথ সিদ্ধান্ত।

সোলার ছাড়াও সাশ্রয়: ইনসুলেশন আর সাশ্রয়ী যন্ত্র

সোলার বসানোর আগেও বিল কমানোর উপায় আছে, আর সেগুলো অনেক সস্তা।

  • ছাদের স্ল্যাবে তাপ নিরোধক দেওয়া, বিশেষ করে টপ ফ্লোরে, গরম অনেক কমায়।
  • দরজা-জানালার ফাঁক বন্ধ করা আর দুপুরের রোদে ভারী পর্দা ব্যবহার করা এসির চাপ কমায়।
  • ইনভার্টার এসি ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চালানো, নিয়মিত সার্ভিস করানো।
  • পুরোনো ফ্রিজ, পাম্প বা বাল্ব বদলে সাশ্রয়ী মডেল নেওয়া, আর অপ্রয়োজনে যন্ত্র চালু না রাখা।

এই কাজগুলো সোলারের সাশ্রয়কেও বাড়িয়ে দেয়। কারণ ঘরের চাহিদা কমলে একই সোলার সিস্টেম চাহিদার বড় অংশ মেটাতে পারে।

ব্যাটারি: লোডশেডিংয়ের সঙ্গী, তবে দামি

ব্যাটারির আসল সুবিধা লোডশেডিংয়ে। গ্রিড না থাকলেও আলো, ফ্যান আর রাউটার চালু রাখা যায়। কিন্তু ব্যাটারিই সিস্টেমের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ায়, আর গরমে ব্যাটারির আয়ু কমে। ভালো মানের লিথিয়াম ব্যাটারি সাধারণত ৮ থেকে ১২ বছর চলার কথা বলা হয়, তবে বাংলাদেশের গরমে বাস্তব আয়ু ৮ থেকে ১০ বছর ধরা বুদ্ধিমানের কাজ। তাই ব্যাটারি কেনার সময় শুধু কেনার দাম নয়, বদলের খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

যাদের মূল লক্ষ্য শুধু বিল কমানো, তাদের জন্য ব্যাটারি ছাড়া অন-গ্রিড সিস্টেমই যথেষ্ট হতে পারে, কারণ গ্রিডই তখন সঞ্চয়ের কাজ করে। যাদের লোডশেডিংয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই, তাদের ব্যাটারির খরচ মেনে নিয়েই এগোতে হবে।

কেনার আগে যে প্রশ্নগুলো করবেন

  • আমার ছাদে কত কিলোওয়াট বসানো যাবে, আর ছাদের ভার নেওয়ার ক্ষমতা কত?
  • সিস্টেমটি নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫ অনুযায়ী হবে কি না, এবং বিতরণ কোম্পানির অনুমোদন কে নেবে?
  • প্যানেল, ইনভার্টার আর ব্যাটারির ওয়ারেন্টি কত বছর, আর সার্ভিস কে দেবে?
  • মোট খরচ, বার্ষিক উৎপাদনের ধারণা আর খরচ ফেরতের সময় লিখিতভাবে দেওয়া হবে কি না?

সৌরবিদ্যুৎ কোনো জাদু নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যার সুফল আসে ধীরে, কিন্তু নিয়মিত। ছাদের অধিকার, সঠিক মানের যন্ত্র আর লিখিত হিসাব — এই তিনটি ঠিক থাকলে সোলার আর সাশ্রয়ী বাড়ি ঢাকার পরিবারের জন্য সত্যিই কাজের হতে পারে।

প্রতিদিনের সম্পত্তি, বাজার ও অর্থের খবর পেতে ফেসবুকে Estate News ফলো করুন: https://www.facebook.com/profile.php?id=61593817347872