ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার অভিজ্ঞতায় একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় — বুকিংয়ের সময় যে তারিখে চাবি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেই তারিখ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ভবন এখনো শেষ হয়নি। ক্রেতা তখন ভাড়া বাসায় থাকতে থাকতে কিস্তি দিচ্ছেন, আর ডেভেলপার বলছেন, পরিস্থিতি তাঁর হাতে ছিল না। সত্যিটা সাধারণত দুই পক্ষের মাঝামাঝি কোথাও থাকে। দেরির পেছনে একটিমাত্র কারণ খুব কমই থাকে; থাকে কয়েকটি কারণের যোগফল।
অনুমোদন: প্রথম ধাপেই সময় যায়
কোনো প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর আগে নকশা অনুমোদনসহ একাধিক ছাড়পত্র নিতে হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ছাড়াও ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা এবং সিটি করপোরেশনের মতো সংস্থার ছাড়পত্রের প্রশ্ন আসে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও সমন্বয়হীন। সংগঠনটি একসময় বলেছিল, সব সংস্থার ছাড়পত্র পেতে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। পরিস্থিতি সব প্রকল্পে এক রকম নয়, কিন্তু ক্রেতার জন্য বার্তাটা স্পষ্ট — অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত নির্মাণ শুরু হয় না, আর অনুমোদনের অপেক্ষা মানেই হস্তান্তরের তারিখ পেছানো।
অর্থের টান: বিক্রি কমলে কাজ থমকায়
আবাসন প্রকল্পের অর্থায়ন অনেকাংশে নির্ভর করে ফ্ল্যাটের অগ্রিম বিক্রির ওপর। বিক্রি ধীর হলে নির্মাণের নগদ প্রবাহ কমে যায়। আবার ব্যাংক ঋণের সুদ বেশি থাকলে ডেভেলপারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। এমন অবস্থায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে চলমান কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে অর্থ ঘুরিয়ে কাজ চালায়; একটি প্রকল্পের বিক্রি আটকে গেলে অন্যগুলোতেও টান পড়ে। ফলে সাইটে কাজ ধীর হয়ে যায়, যদিও বাইরে থেকে তা সব সময় বোঝা যায় না।
নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক: দাম বাড়লে হিসাব বদলায়
সিমেন্ট ও রডের মতো প্রধান নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্থির থাকলে প্রকল্পের বাজেট বদলে যায়। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন খুচরা বাজারে ৫০ কেজির সিমেন্টের বস্তা বিক্রি হচ্ছিল ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকায়, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেশি। একই প্রতিবেদনে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত মানের রডের দাম ছিল প্রতি টন ৯২ হাজার ৫০০ থেকে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। দাম এভাবে বাড়লে ডেভেলপারকে হয় বাড়তি খরচ নিজে বহন করতে হয়, নয়তো কাজের গতি কমাতে হয়। দক্ষ রাজমিস্ত্রি, রড বাঁধাই শ্রমিক ও মিস্ত্রির সংকটও মাঝেমধ্যে কাজের গতি কমিয়ে দেয়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে।
চুক্তিতে কী লেখা থাকে, সেটাই আসল
বিলম্বের ক্ষেত্রে ক্রেতার অধিকার নির্ভর করে চুক্তিপত্রের ভাষার ওপর। রিহ্যাবের আদর্শ চুক্তিপত্রের কাঠামো অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে হস্তান্তর না হলে ক্রেতা বাজারদর অনুযায়ী মাসিক ভাড়া ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন — তবে শর্ত থাকে যে ক্রেতা নিজে কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করেছেন। আবার নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে (১০ শতাংশের বেশি) বাড়লে ডেভেলপার দাম সমন্বয়ের দাবি করতে পারেন, তবে তাঁকে তখন প্রধান সামগ্রীর মূল্যতালিকা ও চালান দেখাতে হয়। এই দুটি ধারাই বোঝায়, চুক্তি পড়ে না দেখলে বিলম্বের দায় ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে ধারণা ভুল হতে পারে।
বুকিংয়ের আগে ক্রেতার যাচাই তালিকা
- ভবনের নকশা অনুমোদিত কি না এবং অনুমোদনের কপি দেখে নিন।
- ডেভেলপারের আগের প্রকল্পগুলো সময়মতো হস্তান্তর হয়েছে কি না, খোঁজ নিন।
- চুক্তিতে হস্তান্তরের তারিখ, গ্রেস পিরিয়ড ও বিলম্বের ক্ষতিপূরণ স্পষ্টভাবে লেখা আছে কি না, দেখুন।
- কিস্তির সময়সূচি নির্মাণের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা যাচাই করুন।
- জমির মালিকানা, মিউটেশন ও ডেভেলপারের সঙ্গে জমির মালিকের চুক্তি — এই কাগজপত্রের অবস্থা জেনে নিন।
- সাইটে সরেজমিন যান: কাজের গতি, শ্রমিকের উপস্থিতি ও সংরক্ষিত নির্মাণসামগ্রী দেখলে অনেক কিছু বোঝা যায়।
দেরি মানেই প্রতারণা নয়, আবার সব দেরিই অনিবার্য নয়। অনুমোদন, অর্থায়ন, সামগ্রীর দাম ও ব্যবস্থাপনা — এই চারটি বিষয়ে আগাম খোঁজ নিলে ক্রেতা অন্তত বুঝতে পারবেন, তিনি কোন ঝুঁকি নিচ্ছেন। আর ডেভেলপারের জন্য শিক্ষাটা সমানভাবে স্পষ্ট: সময়মতো হস্তান্তরই দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে বড় সুনাম।
প্রতিদিনের সম্পত্তি, বাজার ও অর্থের খবর পেতে ফেসবুকে Estate News ফলো করুন: https://www.facebook.com/profile.php?id=61593817347872


