ঢাকার উত্তর-পূর্বে বালু আর শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝখানে গড়ে উঠছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত শহর — পূর্বাচল নিউ টাউন। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৫০ একর, সেক্টর ৩০টি, আবাসিক প্লট ২৬ হাজার ২১৩টি। প্লটের আকার ৩, ৫, সাড়ে ৭ ও ১০ কাঠা। কুড়িল থেকে কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩০০ ফুট সড়কই এই শহরের মেরুদণ্ড।
কাগজে পূর্বাচল একটি পূর্ণাঙ্গ শহর। বাস্তবে এটি এখনো নির্মাণাধীন একটি এলাকা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই ক্রেতার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
যা তৈরি হয়েছে, যা হয়নি
রাস্তার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। বেশির ভাগ প্রধান সড়ক পাকা, সড়কবাতি বসেছে অনেক জায়গায়। কিন্তু সেবার চিত্র সেক্টরভেদে আলাদা। বিভিন্ন নির্দেশিকা ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও পানি কিছু এলাকায় পৌঁছেছে, সব জায়গায় নয়; নতুন করে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, তাই এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হয়; পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পূর্বাচলে কোনো স্কুল, হাসপাতাল বা বাজার চালু হয়নি বলে জানা যায়। ভবন নির্মাণের চিত্রও এখনো ছোট: ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রাজউকের তথ্যে ৪৬০টি ভবনের নকশা অনুমোদন পেয়েছিল, সম্পূর্ণ হয়েছিল ৯০টি, নির্মাণাধীন ছিল ৭৭টি; ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মাত্র তিন শতাধিক প্লটে কাজ চলছিল বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আজ প্লট কিনে কালই পরিবার নিয়ে উঠে পড়া যাবে — এমন ধারণা ভুল হবে। যাঁরা দীর্ঘমেয়াদে থাকার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য পূর্বাচল একরকম; যাঁদের এখনই স্কুল, হাসপাতাল আর বাজার দরকার, তাঁদের জন্য আরেক রকম।
মেট্রো, ড্যাপ আর লিজ — তিনটি বিষয়
প্রথমত, মেট্রো। এমআরটি লাইন-১-এর পূর্বাচল শাখায় ৯টি স্টেশনের পরিকল্পনা আছে, লক্ষ্য ২০৩৩ সাল। এটি এখনো নির্মিত হয়নি। তাই আজকের যাতায়াত নির্ভর করছে ৩০০ ফুট সড়ক আর কুড়িলের যানজটের ওপর। কেনার আগে নিজের স্বাভাবিক যাতায়াতের সময়ে কুড়িল থেকে প্লট পর্যন্ত গিয়ে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয়ত, নতুন সুযোগ। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) সংশোধিত গেজেটে পূর্বাচল ও ঝিলমিলের নির্দিষ্ট শর্তে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) দেওয়া হয়েছে। অন্তত ৩৩৪ দশমিক ৪৫ বর্গমিটারের আবাসিক প্লটে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ এফএআর মিলবে, তবে ১৫ অক্টোবর থেকে ছয় মাসের মধ্যে রাজউকে নকশা জমা দিতে হবে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে প্লিন্থ পর্যন্ত নির্মাণ করতে হবে। সময়সীমা না মানলে পরিকল্পনা অনুমোদন ফির ২০ গুণ জরিমানার বিধান আছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে। নিজের প্লট এই সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা রাজউক-তালিকাভুক্ত স্থপতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত।
তৃতীয়ত, লিজ। পূর্বাচলের প্লট ৯৯ বছরের লিজে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তফসিলভুক্ত আবাসিক প্লট রাজউকের আগাম অনুমতি ছাড়াই বিক্রি করা যায় বলে নির্দেশিকাগুলো জানাচ্ছে। তবে লিজের শর্ত, হস্তান্তরের নিয়ম আর বকেয়া থাকলে কী হয় — তা লিখিতভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও আগেই লিখিতভাবে জিজ্ঞেস করুন, ব্যাংক লিজহোল্ড প্লট কিনতে ঋণ দেয়, নাকি শুধু নির্মাণের জন্য দেয়।
বন্যা, নিষ্কাশন আর কাগজ
পূর্বাচল দুই নদীর মাঝখানে, আর প্রকল্পের জমির প্রায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ হ্রদ ও খালের জন্য রাখা হয়েছে। নতুন স্লুইস গেট আর বক্স কালভার্টের প্রস্তাবও আছে। তবু ক্রেতার উচিত বর্ষায় প্লটের সামনের রাস্তা ও আশপাশের নিচু জায়গা নিজে দেখা, এবং প্লটের সেক্টরে পানি নিষ্কাশনের বর্তমান অবস্থা স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করা। উঁচু ভরাট জমি আর নিচু জমির পার্থক্য কাগজে ধরা পড়ে না, মাঠে ধরা পড়ে।
কাগজ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অন্তত এই বিষয়গুলো দেখুন:
- প্লটের সেক্টর, সড়ক ও নম্বর রাজউকের বরাদ্দপত্রের সঙ্গে মিলছে কি না
- বিক্রেতার নামে মিউটেশন (নামজারি) খতিয়ান ও ডিসিআর আছে কি না
- জমির খাজনা হালনাগাদ কি না, এবং কোনো বকেয়া আছে কি না
- প্লটটি রূপগঞ্জ না কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আওতায় পড়ে — কারণ পূর্বাচলকে ঢাকা জেলার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হলেও ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিষয়ে গেজেট পাওয়া যায়নি বলে নির্দেশিকাগুলো জানাচ্ছে
- নির্মাণের আগে রাজউকের অনুমোদিত নকশা লাগবে, এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণ না করলে জরিমানার কথা উঠেছে — এ বিষয়ে রাজউক থেকে লিখিত তথ্য নিন
কার জন্য পূর্বাচল, কার জন্য নয়
পূর্বাচলের সবচেয়ে বড় সুবিধা পরিকল্পনা: প্রশস্ত সড়ক, সেক্টরভিত্তিক বিন্যাস, খোলা জায়গা আর ভবিষ্যতে মেট্রোর সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সময়: সেবা, স্কুল-হাসপাতাল আর পূর্ণাঙ্গ নাগরিক জীবন আসতে আরও বছর লাগতে পারে, এবং প্রকল্পের সময়সীমা আগেও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে — শেষ বর্ধিত সময়সীমা শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।
তাই প্রশ্নটি শুধু "পূর্বাচলে দাম বাড়বে কি না" নয়। আসল প্রশ্ন: আপনি কবে থাকতে চান, কী কী সেবা আপনার পরিবারের এখনই দরকার, আর অনিশ্চয়তার এই সময়টা আপনি বহন করতে পারবেন কি না। এই তিন প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হলে পূর্বাচল নিয়ে সিদ্ধান্তও পরিষ্কার হবে।
প্রতিদিনের সম্পত্তি, বাজার ও অর্থের খবর পেতে ফেসবুকে Estate News ফলো করুন: https://www.facebook.com/profile.php?id=61593817347872




