ঢাকার যেকোনো নির্মাণস্থলে গেলে চোখে পড়ে একই দৃশ্য: বাঁশের ভারা, হাতে ঢালাই, ইট আর রডের স্তূপ। এর বাইরে আরেকটি পদ্ধতি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে, যেখানে ভবনের অংশ তৈরি হয় কারখানায়, আর সাইটে শুধু জোড়া দেওয়া হয়। এর নাম প্রিকাস্ট আর মডুলার নির্মাণ।
প্রিকাস্ট মানে কংক্রিটের অংশ, যেমন দেয়াল প্যানেল, স্ল্যাব বা সিঁড়ি, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আগে থেকে ঢালাই করা। মডুলার মানে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া: ঘরের অংশবিশেষ, কখনো পুরো কক্ষ, কারখানায় প্রায় সম্পূর্ণ করে সাইটে বসানো। দুটিরই উদ্দেশ্য এক, সাইটের কাজ কমানো, সময় বাঁচানো আর গুণগত মান ধরে রাখা।
বাংলাদেশে যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত
সেতু, কালভার্ট আর বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রিকাস্ট অংশের ব্যবহার বাংলাদেশে নতুন নয়। সেতুর গার্ডার বা পাইলের মতো অংশ কারখানায় তৈরি করে সাইটে বসানো বহু বছর ধরেই চলছে। ভবন নির্মাণে এর ব্যবহার সীমিত হলেও কিছু প্রকল্পে প্রিকাস্ট সিঁড়ি, দেয়াল প্যানেল বা বাউন্ডারি উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। যেখানে অংশের নকশা বারবার একই রকম হয়, সেখানে কারখানা পদ্ধতি কাজ করে। হাউজিং প্রকল্পে একই ধরনের ফ্ল্যাট বহুবার তৈরি হলে প্রিকাস্টের সুবিধা মেলে। একক, ভিন্ন নকশার ভবনে সুবিধা কমে যায়।
যেখানে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে
প্রথম প্রশ্ন পরিবহন। বড় কংক্রিট প্যানেল কারখানা থেকে সাইটে আনা ঢাকার সরু রাস্তায় সহজ নয়। ক্রেন বসানোর জায়গা, রাস্তার ভারবহন ক্ষমতা আর সাইটের আশপাশের ভবন, সবই হিসাবের মধ্যে আসে। এই বাস্তবতাই অনেক প্রকল্পে প্রিকাস্টের ব্যবহার সীমিত রাখে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন জোড়ার মান। কারখানার অংশ যতই ভালো হোক, সাইটে জোড়া ঠিকমতো না হলে পানি চোঁয়ানো বা ফাটলের ঝুঁকি থাকে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় জোড়ার নকশা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে প্রকৌশলীদের তদারকি আর মান পরীক্ষা এখানে বাড়তি গুরুত্ব পায়।
তৃতীয় প্রশ্ন খরচ। কারখানা স্থাপন, ছাঁচ তৈরি আর পরিবহনে শুরুতেই বড় বিনিয়োগ লাগে। অল্প সংখ্যক ভবনে সেই খরচ উঠে আসে না। বড় সংখ্যক একই ধরনের ইউনিট তৈরি হলে হিসাব বদলায়। তাই প্রিকাস্ট সস্তা, এমন সরল দাবি সব প্রকল্পে খাটে না।
ক্রেতা আর নির্মাতার জন্য করণীয়
ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে কেউ যদি শোনেন ভবনটি প্রিকাস্ট বা মডুলার পদ্ধতিতে তৈরি, তাহলে কয়েকটি প্রশ্ন করা উচিত। অংশগুলো কোথায় তৈরি হয়েছে, জোড়ার নকশা কে অনুমোদন করেছে, পানি প্রতিরোধের ব্যবস্থা কী, আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার। লিখিত উত্তর না থাকলে সতর্ক হওয়াই ভালো।
নির্মাতাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। প্রিকাস্ট আর মডুলার পদ্ধতি বাংলাদেশে এগোচ্ছে, তবে তা ধাপে ধাপে, পুরো ভবন এক লাফে নয়। সিঁড়ি, প্যানেল বা পুনরাবৃত্ত অংশ দিয়ে শুরু করা, মান প্রমাণ করা, তারপর পরিসর বাড়ানো, এই পথই বাস্তবসম্মত। প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, ঢাকার রাস্তা, আবহাওয়া আর নির্মাণ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ না খাইলে তা টিকবে না।


