ঢাকার অনেক ভবনে খবরটা আসে একটা নোটিশ দিয়ে। আগামী মাস থেকে সার্ভিস চার্জ এত টাকা বাড়বে। কারণ হিসেবে লেখা থাকে লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তাকর্মীর বেতন বা পানির পাম্পের খরচ। বাসিন্দাদের অনেকেই তখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যান। একদল চুপচাপ মেনে নেন, আরেকদল বকেয়া দেওয়া বন্ধ করেন। দুটো পথই সমস্যা বাড়ায়।
প্রথম কাজটা আসলে খুব সাধারণ। ফি কেন বাড়ছে, তার হিসাব চাওয়া। কোন খাতে কত খরচ বেড়েছে, গত ছয় মাস বা এক বছরের বিলের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটা কতটা বদলেছে, নতুন হারের হিসাব কীভাবে করা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর লিখিতভাবে চান। মৌখিক ব্যাখ্যা সভায় শোনা যায়, কিন্তু পরে তা আর প্রমাণ থাকে না।
সভা ডাকুন, সিদ্ধান্ত লিখে রাখুন
ভবনের সমিতি বা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে লিখিতভাবে সভা চান। সভায় উপস্থিতি, আলোচনার বিষয় আর সিদ্ধান্ত রেজিস্টারে বা কার্যবিবরণীতে লিখে রাখুন। কারা পক্ষে, কারা বিপক্ষে, তা-ও লেখা থাকলে পরে বিতর্ক কমে। সভায় কয়েকটা প্রশ্ন সরাসরি তুলুন। বাড়তি টাকা কি স্থায়ী হবে, না কি নির্দিষ্ট কাজের জন্য সাময়িক? লিফট বা জেনারেটরের মতো বড় মেরামতের জন্য আলাদা তহবিল আছে কি না? যারা সময়মতো দেন, তাদের জন্য কোনো ছাড় বা কিস্তির ব্যবস্থা আছে কি না?
একটা ভুল প্রায়ই দেখা যায়। সভায় শুধু অভিযোগ ওঠে, কিন্তু বিকল্প প্রস্তাব আসে না। খরচ কমানোর বাস্তব উপায় থাকলে সেটা টেবিলে আনুন। যেমন, একাধিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দর নেওয়া, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব আলাদা করে দেখা, বা অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করা। এতে আলোচনা ঝগড়া থেকে সমাধানের দিকে যায়।
হিসাব যাচাইয়ের অধিকার
বাসিন্দা হিসেবে ভবনের যৌথ খরচের হিসাব দেখার অধিকার আপনার আছে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিলের কপি, চুক্তিপত্র আর আগের বছরের আয়-ব্যয়ের বিবরণী চাইতে পারেন। হিসাব দেখতে চাওয়া মানেই কাউকে চোর বলা নয়। নিয়মিত হিসাব প্রকাশ হলে সন্দেহও কমে। যদি হিসাব দিতে গড়িমসি হয়, তাহলে সেটা লিখিতভাবে জানিয়ে রাখুন। তারিখসহ চিঠি বা ইমেইল পরে কাজে লাগে।
খেয়াল রাখুন, ফ্ল্যাটের আকার অনুযায়ী ফি ভিন্ন হতে পারে। বড় ফ্ল্যাটের মালিকের ভাগ বেশি হওয়া স্বাভাবিক, যদি সমিতির নিয়মে তা-ই লেখা থাকে। তাই নিজের ফ্ল্যাটের হিসাবের ভিত্তি কী, তা নিয়মাবলি থেকে মিলিয়ে দেখুন। নিয়মাবলির কপি না থাকলে সমিতির কাছ থেকে চেয়ে নিন।
বকেয়া বন্ধ করা কেন বিপজ্জনক
রাগ করে ফি দেওয়া বন্ধ করলে লিফট বন্ধ, পানি সরবরাহে সমস্যা বা নিরাপত্তা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাতে ক্ষতি সবার। আবার বকেয়া জমলে সমিতি আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবতে পারে। মতবিরোধ থাকলে লিখিত আপত্তি জানিয়ে, সভার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করাই নিরাপদ পথ। আপত্তির চিঠিতে কারণ, দাবি করা হিসাব আর সমাধানের প্রস্তাব স্পষ্ট করে লিখুন।
শেষ কথা সহজ। ফি বাড়া মানেই অনিয়ম নয়, আবার সব বাড়তিই যৌক্তিক নয়। হিসাব দেখুন, সভায় কথা বলুন, সিদ্ধান্ত লিখে রাখুন। এই তিনটা ধাপ মানলে ভবনের পরিবেশও ঠিক থাকে, আর বাসিন্দাদের টাকার হিসাবও পরিষ্কার থাকে।




