বাবা বা মা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সবচেয়ে কঠিন সময়েই সম্পত্তির প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। কে ফ্ল্যাটে থাকবে, কে বিক্রি করতে চায়, কার কতটুকু অংশ: এই প্রশ্নগুলো শোকের মধ্যেই উঠতে পারে। আইনের দিক থেকে বিষয়টা পরিষ্কার। উত্তরাধিকারীরা সবাই মিলে সম্পত্তির যৌথ মালিক হন। কেউ একা পুরো ফ্ল্যাটের মালিক হন না, যতক্ষণ না সবাই মিলে বণ্টন করেন বা অন্যরা আইনসম্মতভাবে নিজেদের অংশ তাকে দিয়ে দেন। এই কথাটা শুরুতে মেনে নিলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়।

প্রথম কাজ কাগজ গোছানো। মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ, পরিবারের সবার জাতীয় পরিচয়পত্র, আর ওয়ারিশ সনদ লাগবে। ওয়ারিশ সনদ দেয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান: সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌরসভার মেয়র বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এই সনদে কারা আইনগত উত্তরাধিকারী, তা লেখা থাকে। বাবার নামে দলিল, খতিয়ান, আগের নামজারি আর খাজনার রসিদও সঙ্গে রাখতে হবে। যৌথভাবে নামজারি করতে চাইলে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সার্কুলার অনুযায়ী, ওয়ারিশ সনদ দিয়েই যৌথ নামজারি করা যায়। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এই সার্কুলারের কথা উল্লেখ আছে। পৃথকভাবে নামজারি করতে চাইলে, অর্থাৎ প্রত্যেকে আলাদা খতিয়ান চাইলে, বণ্টন দলিল লাগবে।

যৌথ নামজারি আর পৃথক নামজারির পার্থক্য

Estate News — Find your dream home

যৌথ নামজারি মানে সবার নাম এক খতিয়ানে, প্রত্যেকের অংশ উল্লেখ করে। এতে ফ্ল্যাটটি যৌথই থাকে, কিন্তু সরকারি রেকর্ডে সবার নাম ওঠে। খাজনা যৌথভাবে দেওয়া যায়। এটা তুলনামূলক সহজ পথ, যখন ভাইবোনেরা এখনই ভাগাভাগি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি, কিন্তু রেকর্ড ঠিক রাখতে চান।

পৃথক নামজারি মানে প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে রেকর্ড করা। এর জন্য সবাই মিলে ঠিক করতে হবে কে কোন অংশ পাবে, আর সেই বণ্টন রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা দলিলে লিখতে হবে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩(বি) ধারার আওতায় এই পৃথক নামজারি হয়, এমনটাই সার্কুলারে বলা আছে। একটি ফ্ল্যাটকে ভৌতভাবে ভাগ করা সব সময় সম্ভব হয় না। তখন এক ভাইবোন ফ্ল্যাটটি রেখে অন্যদের অংশের মূল্য পরিশোধ করতে পারেন, বা সবাই মিলে ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নিতে পারেন। যেটাই হোক, লিখিত সম্মতি ছাড়া এগোনো ঠিক নয়।

বণ্টননামা লেখার সময় যা খেয়াল রাখবেন

Advertise on Estate News

বণ্টননামা শুধু একটি কাগজ নয়, এটা পরিবারের ভবিষ্যতের শান্তির ভিত্তি। এতে প্রত্যেকের নাম, অংশের পরিমাণ, ফ্ল্যাটের পূর্ণ বিবরণ, দাগ-খতিয়ান আর কোনো শর্ত থাকলে তা স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। মুসলিম পরিবারে ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ নির্ধারিত হয়, হিন্দু ও খ্রিষ্টান পরিবারে নিজ নিজ উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য। অংশ নিয়ে সন্দেহ থাকলে আইনজীবীর সঙ্গে বসে হিসাব মিলিয়ে নেওয়া ভালো। ভুল অংশ লিখে রেজিস্ট্রি করলে পরে তা শুধরানো কঠিন আর ব্যয়বহুল হয়।

বণ্টনের সময় ঋণ আর দায়ের কথাও মনে রাখতে হবে। মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ, বাড়ির সার্ভিস চার্জের বকেয়া বা খাজনা বাকি থাকলে, তা আগে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো। না হলে নতুন মালিকদের কাঁধে পুরোনো দায় এসে পড়ে। ফ্ল্যাটে কেউ বসবাস করলে তার থাকার ব্যবস্থা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলুন। মা বেঁচে থাকলে তার থাকার অধিকার আর নিরাপত্তা সবার আগে বিবেচনায় রাখা উচিত।

যে জায়গাগুলোতে জটিলতা তৈরি হয়

সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি হয় তখন, যখন একজন উত্তরাধিকারী নিজের নামে নামজারি করিয়ে নেন আর অন্যরা জানতেও পারেন না। নামজারি মালিকানা তৈরি করে না, এটা শুধু দখল আর রেকর্ডের প্রমাণ। তবু ভুল নামজারি নিয়ে আপত্তি জানাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে যেতে হয়, বা প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। তাই শুরু থেকেই সবাইকে জানিয়ে, সবার সই নিয়ে কাজ করা ভালো।

আরেকটি সাধারণ ভুল হলো বণ্টন না করে ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেওয়া। একজন যৌথ মালিক নিজের অংশ বিক্রি করতে পারেন, কিন্তু পুরো ফ্ল্যাট বিক্রি করতে সবার সম্মতি লাগে। ক্রেতাও পরে বিপদে পড়েন, যদি দেখা যায় বিক্রেতার একার অধিকার ছিল না। তাই ফ্ল্যাট কেনার সময়ও ক্রেতার উচিত ওয়ারিশ সনদ আর বণ্টননামা দেখে নেওয়া।

পরিবারের মধ্যে কথা বলার সময়টা বাঁচিয়ে রাখুন। একজন নিরপেক্ষ আত্মীয় বা আইনজীবীকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখলে আলোচনা সহজ হয়। আদালতে বণ্টন মামলা শেষ উপায় হিসেবে থাকে, কিন্তু তাতে সময়, খরচ আর সম্পর্ক তিনটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেশিরভাগ পরিবারই শান্তভাবে, কাগজ ঠিক রেখে, নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে পারে। ফ্ল্যাটটি বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া স্মৃতি, শুধু একটি সম্পত্তি নয়। সেই সম্মানটা বণ্টনের কাগজেও যেন থাকে, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।