ঢাকার অনেক ফ্ল্যাটে রান্নাঘরটাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ঘর, অথচ সংস্কারের সময় সেটাই থাকে সবার শেষে। সকালে নাশতা, দুপুরের রান্না, রাতে চা: একই ছোট জায়গায় দিনে কয়েকবার কাজ চলে। তাই সংস্কারের পরিকল্পনা শুরু হওয়া উচিত দেখতে কেমন লাগবে, তা দিয়ে নয়। শুরু হওয়া উচিত কোথায় পানি আটকে থাকে, কোন সুইচে হাত যায় না, আর কোন তাক থেকে জিনিস নামাতে সিঁড়ি লাগে, তা দিয়ে।
বাজেটের ধারণা আগে ঠিক করে নেওয়া ভালো। বাংলাদেশের ইন্টেরিয়র প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত ধারণায় একটি রান্নাঘর সংস্কারের খরচ সাধারণত এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে থাকে, আকার ও ফিনিশিং অনুযায়ী। একই ধরনের প্রকাশিত হিসাবে, ১২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের পুরো ইন্টেরিয়রে রান্নাঘরের ভাগ দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়। এই সংখ্যাগুলো কোনো দোকানের নির্দিষ্ট দর নয়। এগুলো পরিকল্পনার জন্য একটি পরিসর, চূড়ান্ত হিসাব আসবে আপনার রান্নাঘরের মাপ আর পছন্দের মালামাল থেকে।
আগে ঠিক করুন পানি আর বিদ্যুৎ
সংস্কারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল হয় তখন, যখন সুন্দর ক্যাবিনেট বসানোর পর দেখা যায় সিংকের নিচে পানি চুঁইয়ে পড়ছে। মিস্ত্রি ডাকার আগে প্লাম্বারকে দিয়ে দেখিয়ে নিন পাইপের অবস্থা, সিংকের ড্রেনেজ আর বেসিনের নিচের অংশ। ঢাকার পুরোনো ফ্ল্যাটে এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি সমস্যা জমে। একই সঙ্গে গ্যাসের চুলা, চিমনি বা এক্সহস্ট ফ্যান আর ফ্রিজের জন্য পয়েন্টগুলো ঠিক আছে কি না, দেখে নিন। দেয়াল ভাঙা বা টাইলস বসানোর পরে বৈদ্যুতিক পয়েন্ট সরানো মানে আবার ভাঙা আর আবার রং করা।
অনেক পরিবার এই ধাপে টাকা বাঁচাতে চায়। বাস্তবে এখানেই টাকা রাখা সবচেয়ে নিরাপদ। ভালো পাইপ, ভালো ফিটিংস আর ঠিকঠাক ড্রেনেজ না থাকলে নতুন ক্যাবিনেটের নিচের বোর্ড কয়েক মাসের মধ্যেই ফুলে যেতে পারে। ঢাকার আর্দ্র আবহাওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বেশি।
টাইলস আর মেঝেতে মাঝামাঝি পথ নিন
রান্নাঘরের টাইলস নিয়ে প্রকাশিত একটি গাইডে সাধারণ টাইলসের দর প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা বলে উল্লেখ আছে, আর প্রিমিয়াম ধরনের দর এর চেয়ে বেশি। দোকানভেদে দর বদলায়, তাই মিরপুর সিরামিক মার্কেট বা পরিচিত দোকানে দুই তিনটি দর নিয়ে তুলনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। হালকা রঙের বড় টাইলস ছোট রান্নাঘরকে কিছুটা খোলামেলা দেখায়, আর ম্যাট ফিনিশে তেলের দাগ কম চোখে পড়ে। মসলা আর তেলের ব্যবহার বেশি, এমন রান্নাঘরে ধোয়া সহজ, এমন টাইলস বেছে নেওয়াই ভালো।
মেঝের পুরোনো টাইলস ভালো অবস্থায় থাকলে পুরোটা তুলে ফেলার দরকার নাও পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাউট পরিষ্কার করা, ভাঙা দুই একটি টাইলস বদলানো আর দেয়ালের নিচের অংশে নতুন টাইলস দেওয়াতেই কাজ হয়। এতে টাকা বাঁচে, আর কাজের সময়ও কমে।
ক্যাবিনেটে বোর্ড আর হার্ডওয়্যারে নজর দিন
ক্যাবিনেটের খরচ বুঝতে শুধু মোট অঙ্ক দেখলেই হবে না। ঢাকার একটি ইন্টেরিয়র প্রতিষ্ঠানের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রকাশিত হিসাবে, ১৮ মিলিমিটার গর্জন প্লাইয়ে রঙের ফিনিশের ক্যাবিনেট প্রতি বর্গফুটে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা, এইচপিএল বা ডুকো ফিনিশে ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা, আর অ্যাক্রিলিক ফিনিশে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা ধরা হয়েছে। এই হিসাবে বার্নার, চিমনি, কাউন্টারটপ, সিংক বা প্লাম্বিং ধরা নেই। তাই কোটেশন নেওয়ার সময় লিখিতভাবে জেনে নিন: বোর্ড কোনটা, শাটারের ফিনিশ কী, হিঞ্জ আর চ্যানেল কোন মানের, আর ইনস্টলেশন কতদূর পর্যন্ত।
ছোট রান্নাঘরে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব তাক ভরে ফেলার দরকার নেই। যেসব জিনিস প্রতিদিন লাগে, সেগুলো হাতের নাগালে রাখুন। ভারী হাঁড়ি-পাতিল নিচের দিকে, হালকা জিনিস উপরে। কোণার জায়গা কাজে লাগাতে ঘূর্ণায়মান তাক বা গভীর ড্রয়ার কাজে আসে। ঢাকার ফ্ল্যাটে রান্নাঘরের দরজা অনেক সময় সরু হয়, তাই ক্যাবিনেটের মাপ নেওয়ার সময় দরজা দিয়ে মাল ঢোকানো যাবে কি না, সেটাও ভেবে রাখুন।
কাজের ক্রম যাতে টাকা বাঁচায়
একটা সহজ ক্রম মেনে চললে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্লাম্বিং আর বৈদ্যুতিক কাজ শেষ করে টাইলস বসান। তারপর ক্যাবিনেটের কাঠামো, তারপর কাউন্টারটপ। সবার শেষে রং, লাইট আর ছোট ফিটিংস। উল্টো ক্রমে কাজ করলে নতুন জিনিসে দাগ লাগে, আবার ঠিক করতে হয়, আর তাতেই বাজেট বাড়ে।
কাজ শুরুর আগে বাড়ির কমিটিকে জানিয়ে রাখুন। ঢাকার অ্যাপার্টমেন্টে শব্দ আর ধুলোর সময় নিয়ে নিয়ম থাকে। সকালে কাজ শুরু আর বিকেলে শেষ করার সময় মেনে চললে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝামেলা কমে। মালামাল রাখার জায়গা, পুরোনো মাল সরানোর ব্যবস্থা আর কাজ শেষে পরিষ্কারের দায়িত্ব, সবকিছু আগেই মিস্ত্রি বা ঠিকাদারের সঙ্গে লিখে নিন। মুখের কথায় কাজ করালে শেষে হিসাব নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়।
সংস্কার শেষে রান্নাঘরটা যেন রোজকার জীবনের সঙ্গে মেলে, সেটাই আসল সাফল্য। চকচকে নতুন রান্নাঘর, যেখানে চায়ের কাপ রাখার জায়গা নেই, তার চেয়ে কিছুটা সাদামাটা কিন্তু গোছানো রান্নাঘর অনেক বেশি কাজের। বাজেট কম হলে একবারে সব না করে ধাপে ধাপে করাই ভালো। পানি আর বিদ্যুৎ ঠিক করে, টাইলস সেরে, তারপর কয়েক মাস পরে ক্যাবিনেট বদলানোও একটা বাস্তব পথ।


