ঘর রঙ করার সময়টা এলে ঢাকার পরিবারগুলো প্রথমে দোকানে যায়, তারপর মিস্ত্রির সঙ্গে দর করে, তারপর বাজেটের হিসাব মেলায়। সেই হিসাবের পেছনে যে শিল্পটা কাজ করে, তার সবচেয়ে বড় নাম বার্জার পেইন্টস। ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মুনাফা ২৪ শতাংশ বেড়ে ৭৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। একই প্রান্তিকে বিক্রি ১৩ শতাংশ বেড়ে ৭০৪ কোটি টাকা হয়েছে, আর শেয়ারপ্রতি আয় ১৩ টাকা ৮ পয়সা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা ৯৭ পয়সা হয়েছে।

অর্ধবার্ষিক হিসাবটা আরও স্পষ্ট। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর, এই ছয় মাসে বার্জারের মুনাফা ৭৪ শতাংশ বেড়ে ২৬০ কোটি টাকা হয়েছে, আর বিক্রি ১৩ শতাংশ বেড়ে ১,৫১৮ কোটি টাকা হয়েছে। কোম্পানির ভাষায়, এই বৃদ্ধির পেছনে আছে বেশি বিক্রি, কাঁচামাল আর প্যাকেজিংয়ের দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম সমন্বয়, আর ঋণের সুদ খরচ কমে যাওয়া। অর্থাৎ, রঙের দাম বেড়েছে, কিন্তু বিক্রিও বেড়েছে, আর সেই সমন্বয়েই মুনাফা বেড়েছে।

দাম বাড়লেও বিক্রি বাড়ে কেন

Estate News — Find your dream home

রঙের বাজারে দাম বাড়া মানেই বিক্রি কমে যাওয়া নয়। বাড়ি বানানো শেষ হলে রঙ করতেই হয়, পুরোনো ফ্ল্যাটের সংস্কারেও রঙ লাগে। এই চাহিদা কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু বাতিল করা যায় না। তাই কাঁচামালের দাম বাড়লে কোম্পানি দাম বাড়ায়, আর ক্রেতা কিছুটা দেরি করে হলেও কেনে। বার্জারের প্রান্তিক ফলাফল সেই চিত্রটাই দেখাচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। বার্জার তার কাঁচামালের বড় অংশ বিদেশ থেকে আনে। ডলারের দাম নড়লে আমদানির খরচ বাড়ে। আগের এক প্রতিবেদনে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, বিক্রি প্রতি ১০০ টাকায় পণ্যের খরচ ৬৭ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৮ টাকা ৭৭ পয়সা হয়েছে। এই চাপের মধ্যেও মুনাফা বাড়ার অর্থ হলো, দাম সমন্বয় আর বিক্রির পরিমাণ মিলে খরচের ধাক্কাটা সামলানো গেছে। তবে এটা কোনো নিশ্চয়তা নয় যে আগামী প্রান্তিকেও একই চিত্র থাকবে। কাঁচামালের দাম আবার বাড়লে, বা নির্মাণ কাজ কমে গেলে, বিক্রির গতি বদলে যেতে পারে।

মিরসরাইয়ে তৃতীয় কারখানা: বড় বাজি, দেরি হওয়া সময়সূচি

বার্জারের সবচেয়ে বড় বাজিটা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তার তৃতীয় কারখানা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি এই কারখানায় বিনিয়োগ ২০৪ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১,১৮৪ কোটি টাকা করেছে। বাড়তি খরচের কারণ হিসেবে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেশি স্বয়ংক্রিয়করণ আর ডিজিটালাইজেশন, এবং মুদ্রাস্ফীতি আর বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতার প্রভাব উল্লেখ করা হয়েছে। উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়ে ২০২৮ সালের এপ্রিল করা হয়েছে।

Advertise on Estate News

কারখানার অবকাঠামো বানাচ্ছে অ্যাসোসিয়েটেড বিল্ডার্স করপোরেশন, ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুযায়ী। চুক্তিতে কাঁচামালের বড় গুদাম, ইউটিলিটি ভবন আর শ্রমিকদের সুবিধার কথা আছে। নতুন কারখানা চালু হলে বার্জারের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে, আর মিরসরাই অঞ্চলে কর্মসংস্থান আর দক্ষ জনবল তৈরির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২৮ সালের এপ্রিল এখনও দূরে। তার আগে বাজারে সরবরাহের চাপ থাকলে, দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি চিত্রটাও এখানে প্রাসঙ্গিক। বার্জারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৩৭২ কোটি টাকা, আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি, আর কোম্পানিটি ৫২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। একটি বড় কোম্পানির স্থিতিশীল মুনাফা বাজারের জন্য ভালো খবর, কারণ তাতে সরবরাহ আর মানের ধারাবাহিকতা থাকে। কিন্তু ক্রেতার জন্য আসল প্রশ্নটা আলাদা: এই ফলাফল তাঁর ঘরের বাজেটে কী বদলায়।

ঘর রঙ করার বাজেটে এর অর্থ কী

রঙের খরচ শুধু রঙের দাম নয়। এর সঙ্গে আছে মিস্ত্রির মজুরি, প্রাইমার, পুটি, ব্রাশ আর রোলার, আর পুরোনো রঙ তোলার খরচ। বার্জারের দাম সমন্বয়ের খবর থেকে বোঝা যায়, রঙের দাম স্থির থাকবে, এমন আশা করা ঠিক নয়। বাজেট করার সময় তাই কিছুটা বাড়তি ধরা উচিত, আর দোকান থেকে লিখিত দাম নেওয়া উচিত।

  • দুটি দোকানে দাম মিলিয়ে নিন: একই পণ্য, একই পরিমাণের জন্য দুটি দোকানের দাম তুলনা করুন।
  • কভারেজ জিজ্ঞেস করুন: এক লিটার রঙে কত বর্গফুট হয়, তা জেনে মোট পরিমাণ হিসাব করুন।
  • প্রাইমার আর ফিনিশ আলাদা ধরুন: শুধু ফিনিশ কোটের দামে বাজেট করলে হিসাব কম পড়বে।
  • মিস্ত্রির মজুরি লিখিত নিন: মজুরি দিনপ্রতি নাকি বর্গফুট প্রতি, তা আগেই পরিষ্কার করুন।
  • নমুনা দেখে রঙ ঠিক করুন: দোকানের আলো আর ঘরের আলো এক নয়। ছোট নমুনা ঘরের দেওয়ালে লাগিয়ে দিনের আলোয় দেখুন।

রঙের শিল্পের খবর অনেক সময় শুধু শেয়ারবাজারের খবর মনে হয়। আসলে তা ঘরের খবরও বটে। বার্জারের মুনাফা বাড়া, দাম সমন্বয় আর মিরসরাইয়ের কারখানায় বড় বিনিয়োগ, এই তিনটি মিলে বলছে, রঙের চাহিদা আছে, কিন্তু খরচের চাপও আছে। ঘর রঙ করার পরিকল্পনা থাকলে, এই চাপটা বাজেটে ধরেই এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ।