বাংলাদেশে সিমেন্টের অভাব নেই। কারখানা আছে, ব্র্যান্ড আছে, দোকানে বস্তা আছে। তবু সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সহজ নয়। কারণ এই বাজারের মূল সমস্যা ঘাটতি নয়, বাড়তি ক্ষমতা।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ২০২৬ সালের একটি শিল্প পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশে সিমেন্টের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ৯২ মিলিয়ন টন, আর বার্ষিক দেশীয় চাহিদা প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ ব্যবহারের হার ৪৩ শতাংশের কাছাকাছি। এই একটি সংখ্যাই বাজারের অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। কারখানা চালু রাখতে হলে কোম্পানিকে দামে ছাড় দিতে হয়, ডিলার নেটওয়ার্ক ধরে রাখতে হয়, আর প্রকল্পের অর্ডারের জন্য লড়তে হয়।
বড় ব্র্যান্ডগুলো কারা
এই বাজারে শাহ সিমেন্ট বড় নাম, আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। বসুন্ধরা সিমেন্ট বসুন্ধরা গ্রুপের, আধুনিক ভার্টিক্যাল রোলার মিল প্রযুক্তির কথা বলে। ক্রাউন সিমেন্ট এম. আই. সিমেন্টের, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। প্রিমিয়ার সিমেন্টও তালিকাভুক্ত কোম্পানি। আর লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক হোলসিম গ্রুপের অংশ, সুরমা প্ল্যান্ট আর মেঘালয় থেকে চুনাপাথর আনার ক্রস-বর্ডার কনভেয়ার ব্যবস্থার জন্য পরিচিত।
এই নামগুলো শুধু বিজ্ঞাপনের জন্য নয়। বড় প্রকল্পে ঠিকাদাররা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিমেন্ট চান, কারণ শক্তি, জমাট বাঁধার সময় আর সরবরাহের ধারাবাহিকতা পরীক্ষিত থাকতে হয়। আবার বাড়ি বানানো ক্রেতার কাছে ব্র্যান্ড মানে ভরসা: ব্যাগের ওজন ঠিক আছে কিনা, মজুতের সময় সিমেন্ট জমাট বেঁধে যায় কিনা, এসব ছোট বিষয়ই বড় হয়ে ওঠে।
চাহিদা কোথা থেকে আসে
ইনডেক্সবক্সের ২০২৬ সালের বাজার প্রতিবেদনের অনুমান অনুযায়ী, অবকাঠামো ও সরকারি কাজ থেকে আসে চাহিদার ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ, আর আবাসিক নির্মাণ থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। এই দুই খাত একসঙ্গে না বাড়লে সিমেন্টের বাজার চাপে পড়ে। সরকারি প্রকল্প ধীর হলে আবাসিক নির্মাণকে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়, আর আবাসিক নির্মাণ ধীর হলে সরকারি কাজের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
আরেকটি চাপ আসে কাঁচামাল থেকে। একই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ক্লিংকারের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে ডলারের দাম, জাহাজ ভাড়া আর সরবরাহকারী দেশের নীতি, সবই দেশের সিমেন্টের খরচে প্রভাব ফেলে। কারখানা দেশে থাকলেও কাঁচামালের বাজার আন্তর্জাতিক।
বাড়ি বানানো মানুষের জন্য সিমেন্ট কেনার সময় কয়েকটি বিষয় দেখা জরুরি। ব্যাগের উৎপাদন তারিখ, ব্যাগ ফেটে গেছে কিনা, আর মজুতের জায়গা শুকনো কিনা, এসবই কাজের মান ঠিক করে। ভেজা জায়গায় রাখা সিমেন্ট জমাট বেঁধে যায়, আর সেই সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করলে শক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অল্প অল্প করে কেনা, আর কেনার পর দ্রুত ব্যবহার করা, অনেক সময় একসঙ্গে বেশি কিনে রাখার চেয়ে ভালো।
ডিলার নেটওয়ার্কও এই বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। শহরের বড় দোকান থেকে গ্রামের ছোট দোকান পর্যন্ত সিমেন্ট পৌঁছায় ডিলারদের হাত ধরে। বড় ব্র্যান্ডগুলো এই নেটওয়ার্ক ধরে রাখতে ছাড়, পরিবহন সুবিধা আর সময়মতো সরবরাহের ওপর জোর দেয়। ক্রেতার কাছে এর মানে হলো, পরিচিত দোকান থেকে কেনা অনেক সময় অপরিচিত উৎসের চেয়ে নিরাপদ, কারণ ব্যাগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দোকানদারকে ধরা যায়।




