নারায়ণগঞ্জকে শুধু ঢাকার পাশের শহর বললে তার অর্ধেক পরিচয় বাদ পড়ে। এটি নদীবন্দর, বস্ত্রশিল্পের শহর, ব্যবসার পুরোনো কেন্দ্র। শীতলক্ষ্যার ঘাটে এখনো নৌকা ভেড়ে, বাজারে এখনো সকালের ভিড় জমে, আর সেই পুরোনো শহরের গলির পাশেই উঠছে নতুন নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ভবন।
এই দুই চেহারার টানাপোড়েনই নারায়ণগঞ্জের আবাসনের গল্প। একদিকে পুরোনো বাড়ি, সরু রাস্তা, পরিচিত পাড়া। অন্যদিকে লিফট, গাড়ি রাখার জায়গা, ছাদ আর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন ফ্ল্যাট। ক্রেতা দুটোর মধ্যে বেছে নিচ্ছেন না শুধু দাম দেখে। দেখছেন যাতায়াত, স্কুল, বাজার আর নদীর কাছাকাছি থাকার সুবিধা-অসুবিধা।
চাষাঢ়া থেকে ফতুল্লা: নতুন এলাকার মানচিত্র
চাষাঢ়া এখনো শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে বাজার, কলেজ, হাসপাতাল আর প্রশাসনিক কাজের সুবিধা একসঙ্গে মেলে। ফতুল্লা আর সিদ্ধিরগঞ্জের দিকে নতুন ভবনের সংখ্যা বাড়ছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে খোলা জায়গা পাওয়া যায়। যাঁরা ঢাকায় কাজ করেন কিন্তু নারায়ণগঞ্জে থাকতে চান, তাঁদের কাছে যাত্রাবাড়ী সংযোগ আর সড়কের অবস্থা বড় প্রশ্ন।
সরকারি আবাসন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতাও এখানে আলোচনায় থাকে। ইউএনবির খবরে বলা হয়েছে, আলীগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৬৭২টি ফ্ল্যাটের প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে, আটটি ১৫ তলা ভবনে। বারবার সময় বাড়িয়ে সর্বশেষ সময়সীমা করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন। প্রকল্পের জমি ১১.৬৫ একর, আর দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪০৪.০৪ কোটি টাকা। এই তথ্য বোঝায়, বড় প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়াটাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
নদী আর সেতু যেভাবে এলাকা বদলায়
শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের পরিচয়, আবার তার সীমাও। নদীর পাড়ের জমি, সেতুর সংযোগ আর বন্যার সময় পানি ওঠার ইতিহাস, সবই ফ্ল্যাট কেনার আগে জানা দরকার। সেতু করিডর যাতায়াত সহজ করে, কিন্তু সেতুর মুখে যানজট থাকলে সেই সুবিধা অর্ধেক হয়ে যায়। তাই ক্রেতার উচিত অফিস সময়ে নিজে রাস্তাটা ঘুরে দেখা।
পুরোনো শহরে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: জমির কাগজ। পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন ভবন হলে উত্তরাধিকার, দলিল আর অনুমোদনের ইতিহাস পরিষ্কার থাকা চাই। নতুন এলাকায় দেখতে হবে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন আর রাস্তার প্রস্থ। সুন্দর ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন এসব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, কাগজ আর পাড়ার মানুষ দেয়।
নারায়ণগঞ্জের বাজার আর ঘাটের জীবনও আবাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যাঁরা বাজারের কাছাকাছি থাকেন, তাঁদের সকাল শুরু হয় ভিড় আর হাঁকডাকে। যাঁরা একটু দূরে থাকেন, তাঁরা শান্তি পান, কিন্তু বাজার আর স্কুলের দূরত্ব মেনে নিতে হয়। নতুন ফ্ল্যাট কেনার সময় এই দৈনন্দিন হিসাবটা কাগজের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সকালে কতক্ষণে বাচ্চা স্কুলে পৌঁছাবে, বৃষ্টির দিনে রাস্তায় পানি জমে কিনা, আর সন্ধ্যার পর রাস্তায় আলো থাকে কিনা, এসবই শেষ পর্যন্ত বসবাসের মান ঠিক করে।
ভাড়াটে পরিবারের জন্যও নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব আছে। কারখানা আর ব্যবসার কাজে আসা অনেক পরিবার প্রথমে ভাড়া থাকেন, পরে কেনার কথা ভাবেন। তাঁদের জন্য ছোট ফ্ল্যাট, নিরাপদ সিঁড়ি আর পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা বড় ফ্ল্যাটের চেয়ে কম দরকারি নয়। শহর যদি শুধু বড় ক্রেতার কথা ভাবে, তাহলে তার আসল বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জ এখন আর শুধু শিল্পশহর নয়। এটি এমন একটি শহর, যেখানে পুরোনো ব্যবসায়ী পরিবার, কারখানার শ্রমিক, সরকারি চাকরিজীবী আর ঢাকামুখী তরুণ পেশাজীবী একসঙ্গে থাকছেন। আবাসন যদি এই মিশ্র জীবনের কথা মাথায় রেখে গড়ে ওঠে, তবেই নদীর শহরের নতুন ভবনগুলো সত্যিকারের পাড়া হয়ে উঠবে।


