কান্তনগর গ্রামে পৌঁছাতে দিনাজপুর শহর থেকে উত্তরে যেতে হয় প্রায় ১৯ কিলোমিটার। ধেপা নদীর ধারে শান্ত গ্রামের ভেতর হঠাৎ চোখে পড়ে মন্দিরটি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ইটের তৈরি এক উঁচু ভবন। কাছে গেলে বোঝা যায়, পুরো ভবনটাই যেন একটা ছবির বই। দেয়ালজুড়ে পোড়ামাটির ফলক, আর প্রতিটি ফলকে একেকটি গল্প।
মন্দিরটি তৈরি শুরু করেন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ, ১৭০৪ সালে। কাজ শেষ হয় তাঁর দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথের আমলে, ১৭২২ সালে। কোনো কোনো সূত্রে সমাপ্তির সাল হিসেবে ১৭৫২ সালের কথাও আছে, তাই সাল নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। মন্দিরটি কৃষ্ণকে উৎসর্গ করা, এখানে তিনি কান্তজিউ নামে পূজিত হন। স্ত্রী রুক্মিণীও এখানে পূজিতা।
নয় চূড়ার মন্দির
কান্তজিউ মন্দির তৈরি হয়েছিল নবরত্ন ধাঁচে, অর্থাৎ নয়টি চূড়া ছিল এর মাথায়। তিনতলা এই মন্দির উঁচু ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে নয়টি চূড়াই ভেঙে পড়ে। আজ মন্দিরের যে রূপ চোখে পড়ে, তা সেই ভূমিকম্পের পরের রূপ। চূড়া নেই, কিন্তু দেয়ালের কাজ আগের মতোই আছে।
মন্দিরের আসল সম্পদ এর পোড়ামাটির ফলক। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, দেয়ালে প্রায় ১৫ হাজার ফলক রয়েছে। ফলকে ফুটে উঠেছে রামায়ণ আর মহাভারতের কাহিনি, কৃষ্ণের জীবনের ঘটনা, ফুল-লতাপাতা, পশুপাখি আর সেকালের সাধারণ মানুষের জীবন। শিল্পীরা মাটির ফলকে গোটা একটা সমাজকে ধরে রেখেছেন। আজ যাঁরা মন্দির দেখতে যান, তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ফলক দেখেই কাটিয়ে দেন।
মাটির শিল্পের ইতিহাস
বাংলার মন্দিরশিল্পে পোড়ামাটির কাজের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। কান্তজিউ সেই ঐতিহ্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন। ইটের গাঁথুনির ওপর পোড়ামাটির ফলক বসিয়ে পুরো ভবনকে শিল্পকর্মে বদলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ের কারিগরদের হাতের কাজ আজও টিকে আছে, যদিও তিনশো বছরের রোদ-বৃষ্টি ফলকের ওপর দিয়ে গেছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটির দেখভাল করে। সংরক্ষণের কাজ চলেছে বিভিন্ন সময়ে। মন্দিরের পাশে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার কাজের কথাও জানা যায়। যাঁরা দিনাজপুর বেড়াতে যান, তাঁদের অনেকের তালিকায় কান্তজিউ থাকে সবার ওপরে।
আজকের কান্তনগর
মন্দির আজও ভক্ত আর দর্শনার্থীদের জায়গা। সারা বছরই মানুষ আসে, কেউ পূজা দিতে, কেউ ইতিহাস দেখতে, কেউ শুধু ফলকের ছবি তুলতে। গ্রামের জীবন মন্দিরকে ঘিরেই চলে। দোকানপাট, রাস্তা, মানুষের চলাচল, সবকিছুর কেন্দ্রে এই মন্দির।
দিনাজপুরের এই মন্দির ঢাকার মানুষের কাছেও একটা নাম। বাংলাদেশের ঐতিহ্য নিয়ে কথা উঠলে কান্তজিউয়ের নাম আসেই। কারণ এখানে ইতিহাস শুধু বইয়ে নেই, দেয়ালে লেখা আছে। আর সেই দেয়াল দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে, আজও।


