সকাল ছয়টায় গাজীপুরের টঙ্গী, কোনাবাড়ি আর কাশিমপুরের রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। কারখানার গেটের দিকে হাঁটছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিক, কারও হাতে টিফিনের বাক্স, কারও কাঁধে ব্যাগ। তাঁদের বেশির ভাগের বাসা হাঁটা দূরত্বেই, কারখানার পাশের গলিতে। গাজীপুরের আবাসনের গল্পটি এই হাঁটা দূরত্ব থেকেই শুরু।

গাজীপুর এখন শুধু কারখানার জেলা নয়, এটি লাখো পরিবারের বসতের জেলাও। পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল মিল আর ছোট ছোট শিল্প ইউনিট ঘিরে গড়ে উঠেছে ভাড়া বাড়ির একটি পুরো বাজার। সেই বাজারটি কেমন, আর সেখানে যাঁরা থাকেন তাঁদের জীবন কেমন, তা জানলে ঢাকার আবাসনের চাপের একটি বড় অংশ বোঝা যায়।

কারখানার পাশে বসত

Estate News — Find your dream home

গাজীপুরে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা দূরত্ব। কারখানার পাশে থাকলে যাতায়াতে সময় আর ভাড়া দুটোই বাঁচে। সকালের শিফটে যাঁরা যান, তাঁদের জন্য এই দূরত্বই সব। তাই কারখানার গেটের আশপাশের গলিগুলোতে ভাড়া বাড়ির চাহিদা সব সময় বেশি। বাড়িওয়ালারা ছোট ছোট ঘর বানিয়ে ভাড়া দেন, আর শ্রমিকেরা কয়েকজন মিলে একটি ঘর ভাগ করে নেন।

এই বসতের ধরন ঢাকার ফ্ল্যাট বাজার থেকে আলাদা। এখানে বড় ড্রয়িং রুম বা গাড়ি রাখার জায়গার প্রশ্ন ওঠে না। প্রশ্ন ওঠে পানি আসে কি না, বিদ্যুৎ থাকে কি না, আর গলি দিয়ে রাতে হেঁটে ফেরা যায় কি না। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই একটি বাসার মান ঠিক করে।

মেস থেকে পারিবারিক ফ্ল্যাট

গাজীপুরে প্রথম আসা শ্রমিকেরা সাধারণত মেসে থাকেন। এক ঘরে কয়েকজন, রান্না ভাগাভাগি, খরচ ভাগাভাগি। মেস জীবন কঠিন হলেও এটি নতুন আসা মানুষের জন্য সবচেয়ে সস্তা পথ। কয়েক বছর কাজ করে আয় একটু বাড়লে অনেকে পরিবার নিয়ে আসেন। তখন খোঁজ শুরু হয় পারিবারিক ভাড়া ফ্ল্যাটের। দুটি ঘর, একটি রান্নাঘর আর একটি বাথরুম, এই হলো স্বপ্নের তালিকা।

সন্তানদের স্কুলের প্রশ্নও তখন ওঠে। কারখানার পাশে স্কুল থাকলে মায়েরা নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারেন। তাই ভালো স্কুলের কাছের বাসার চাহিদা বেশি। এই চাহিদা দেখে অনেক এলাকায় ছোট ছোট স্কুল আর কোচিং গড়ে উঠেছে।

ভাড়া নেওয়ার আগে যা দেখবেন

Advertise on Estate News

ভাড়া নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় দেখে নেওয়া ভালো। প্রথমে পানি। টিউবওয়েল নাকি সাপ্লাইয়ের পানি, দিনে কতক্ষণ আসে, তা জিজ্ঞেস করুন। তারপর বিদ্যুৎ। লোডশেডিং হলে কী হয়, জেনারেটর আছে কি না। তারপর গ্যাস। রান্নার গ্যাসের ব্যবস্থা কী, তা জেনে নিন।

বর্ষায় গলিতে পানি জমে কি না, সেটিও দেখুন। গাজীপুরের নিচু এলাকায় বর্ষার পানি বড় সমস্যা হতে পারে। শুকনো মৌসুমে দেখে ভাড়া নিলে বর্ষায় বিপদে পড়তে হয়। সম্ভব হলে পাশের বাসার লোকজনের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁরা জানেন ভবনটির আসল অবস্থা।

ভাড়ার চুক্তিটিও লিখিতভাবে করুন। মাসিক ভাড়া কত, অগ্রিম কত, কবে দিতে হবে, আর কতদিনের নোটিশে ছাড়তে হবে, সব লিখে রাখুন। মুখের চুক্তিতে পরে ঝামেলা হয়।

যা বদলাচ্ছে

গাজীপুরের শ্রমিকদের জীবনে একটি ভালো খবর আছে। গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে, চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী। শ্রমিকেরা মাসে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি চাইছেন, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার জায়গায়, যা নির্ধারিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। নতুন মজুরি কাঠামোয় প্রথম বেতন আসবে জানুয়ারিতে। আয় বাড়লে বাসার মানের দাবিও বাড়ে, আর সেটিই গাজীপুরের আবাসন বাজারকে সামনে এগিয়ে নেবে।

রেহাবের নতুন নেতৃত্ব সাভার, গাজীপুর আর কেরানীগঞ্জে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ছোট ফ্ল্যাটের পরিকল্পনার কথা বলেছে। ঢাকার ভেতরে এই দামে ফ্ল্যাট সম্ভব নয় বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এই পরিকল্পনা বাস্তব হলে গাজীপুরে কাজ করা পরিবারগুলোর নিজের ফ্ল্যাটের স্বপ্ন আরও কাছে আসবে।

সাশ্রয়ী ফ্ল্যাটের আশা

গাজীপুরের আবাসন বাজার এখনও মূলত ভাড়ার বাজার। কিন্তু এর ভেতরেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। কারখানার পাশে পাকা রাস্তা হচ্ছে, পানির লাইন যাচ্ছে, স্কুল বাড়ছে। যাঁরা ভাড়া থেকে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যেতে চান, তাঁদের জন্য সাশ্রয়ী ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা একটি আশার কথা।

শ্রমিকের বাসা নিয়ে কথা বললে প্রায়ই শুধু সমস্যার কথা ওঠে। কিন্তু গাজীপুরের গল্পে আরও একটি দিক আছে। এখানে লাখো মানুষ কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, পরিবার নিয়ে এসেছেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েছেন। তাঁদের বাসা ছোট হতে পারে, কিন্তু সেই বাসা ঘিরেই তাঁদের জীবন গড়ে উঠছে। আবাসনের পরিকল্পনা যদি এই মানুষগুলোর কথা মাথায় রেখে হয়, তবে গাজীপুর ঢাকার চাপ কমানোর পাশাপাশি নিজেও একটি ভালো শহর হয়ে উঠবে।