ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া থেকে আড়াই কিলোমিটার উত্তরে গেলেই রাস্তাটা বদলে যায়। পাকা সড়ক শেষ হয়ে শুরু হয় একটি সরু গলি। গড়ে পাঁচ মিটার চওড়া, ছয়শ মিটার লম্বা। দুই পাশে সারি সারি ইটের বাড়ি। এটাই পানাম নগর। একসময় এখানে বণিকরা থাকতেন, ব্যবসা করতেন। এখন বাড়িগুলো ফাঁকা, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে। আর এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই পানাম নগরের আসল গল্প।
বাংলাপিডিয়া জানায়, পানাম, প্রাচীন পাইনাম, সোনারগাঁয়ের একটি এলাকা। ত্রয়োদশ শতকের সপ্তম দশকে গড়ে ওঠা সোনারগাঁয়ের হিন্দু রাজধানীর জায়গা বলে এটি পরিচিত। মুঘলরা ১৬১১ সালে সোনারগাঁ দখলের পর সড়ক আর সেতু বানিয়ে পানামকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করে। পানাম সেতু, দালালপুর সেতু আর পানামনগর সেতু নামে মুঘল আমলের তিনটি ইটের সেতু এখনো টিকে আছে। কিন্তু আজকের পানাম নগরের জন্ম আরও পরে, বাণিজ্যের হাত ধরে।
মসলিন থেকে বণিকপল্লি
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পানামে কারখানা বসিয়ে মসলিন আর সুতি কাপড় কিনত। কোম্পানি তাঁতিদের দাদনি হিসেবে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা অগ্রিম দিত। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে তখন পানাম আর আশপাশে প্রায় ১,৪০০ হিন্দু ও মুসলমান তাঁতি পরিবার ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে সোনারগাঁ সুতি কাপড়, বিশেষ করে ইংরেজি থান কাপড়ের ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে নতুন পানামনগর। ঊনবিংশ শতকে ব্যবসা থেকে উঠে আসা একদল হিন্দু তালুকদার এখানে বাড়ি বানান। টিকে থাকা ইটের বাড়িগুলো তাঁদেরই। পুরোনোগুলো ঊনবিংশ শতকের গোড়ার, পরেরগুলো ঊনবিংশ শতকের শেষ আর বিংশ শতকের গোড়ার দিকের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত পানাম ফুলেফেঁপে ছিল।
বায়ান্নটি বাড়ি, একটি রাস্তা
পানাম নগরের গড়নটাই একে আলাদা করে। রাস্তার উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি, মোট ৫২টি বাড়ি জরাজীর্ণ আর পরিত্যক্ত অবস্থায় চিহ্নিত হয়েছে। বাড়িগুলো এক থেকে তিন তলা, কোনোটা লাগোয়া, কোনোটা আলাদা। গড়নের দিক থেকে তিন ধরনের বাড়ি চোখে পড়ে: বড় হলঘরকেন্দ্রিক, খোলা উঠোনকেন্দ্রিক আর দুইয়ের মিশেল। মুঘল, ঔপনিবেশিক আর হিন্দু স্থাপত্যের মিশেলে তৈরি এসব বাড়ির সামনে খিলান, স্তম্ভ আর কারুকাজ। রাস্তার শেষে পানাম বাজার। একসময় এই রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি চলত, বণিকরা যাতায়াত করতেন।
ফাঁকা হওয়া আর সংরক্ষণ
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাসিন্দারা ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর হিন্দু পরিবারগুলোর চলে যাওয়া পানামকে প্রায় পুরোপুরি ফাঁকা করে দেয়। এরপর দখল আর অবহেলায় বাড়িগুলো ভাঙতে থাকে। ২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড পানাম নগরকে বিশ্বের ১০০টি বিপন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় রাখে। ২০০৯ সালে সরকার বায়ান্নটি বাড়ি আর পুরো এলাকাকে বেআইনি দখল থেকে মুক্ত করে। এরপর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এলাকাটিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এখন অধিদপ্তরই পানাম নগরের দেখভাল করে।
সংরক্ষণের প্রশ্নটা এখানে শুধু পুরোনো বাড়ি বাঁচানোর নয়। পানাম নগর সোনারগাঁয়ের পর্যটনের কেন্দ্র। দর্শনার্থী এলে স্থানীয় দোকান, নৌকা, খাবারের ব্যবসা চলে। কিন্তু ভাঙা বাড়িতে দর্শনার্থী ঢোকানো ঝুঁকির। সংরক্ষণ মানে তাই দুই কাজ একসঙ্গে: বাড়ি মেরামত আর দর্শনার্থীর নিরাপত্তা। পানামের বাড়িগুলো আর কখনো বসতবাড়ি হবে না। সেগুলো টিকে থাকবে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে, আর সোনারগাঁয়ের মানুষের আয়ের উৎস হিসেবে। একটি রাস্তা, বায়ান্নটি বাড়ি আর কয়েক শ বছরের বাণিজ্যের গল্প: পানাম নগরকে বাঁচিয়ে রাখা মানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ইতিহাসের একটা অধ্যায়কে বাঁচিয়ে রাখা।


