নাটোর শহরের ভেতরে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়ে গাছপালা আর পুকুর। তারপর আসে প্রাসাদ। উঁচু দেয়াল, পুরোনো ভবন, সামনে খোলা মাঠ। নাটোর রাজবাড়ি একটিমাত্র ভবন নয়। এটি একটি প্রাসাদচত্বর, যেখানে একসময় নয়টি ভবন ছিল। ছোট তরফ আর বড় তরফ, কাছারি, রানী ভবন, অতিথিশালা, মন্দির। আজ তার কিছু অংশ টিকে আছে, কিছু ভেঙে গেছে, কিছু নতুন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবু দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এখানে একসময় কত বড় একটি সংসার চলত।
নাটোর রাজবংশের শুরু অষ্টাদশ শতকের গোড়ায়। ১৭০৬ সালে পাংগা বানগাছির জমিদাররা রাজস্ব দিতে না পারায় তাদের জমিদারি কেড়ে নেওয়া হয়। দেওয়ান রঘুনন্দন সেই পরগণা তার ভাই রামজীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এভাবেই নাটোর রাজবংশের পত্তন হয়। রাজা রামজীবন ছিলেন এই বংশের প্রথম রাজা। তিনিই নাটোরে রাজবাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। প্রথম প্রাসাদটি ১৭০৬ থেকে ১৭১০ সালের মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রাসাদের চারপাশে দুই স্তরের পরিখা খনন করা হয়েছিল, যাতে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
রানী ভবানীর চার দশক
নাটোর রাজবাড়ির নামের সঙ্গে যে নামটি সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে, তা হলো রানী ভবানী। রামজীবনের পুত্র রামকান্তের সঙ্গে ১৭৩০ সালে তার বিয়ে হয়। রামকান্তের মৃত্যুর পর ১৭৪৮ সালে নবাব আলীবর্দী খান জমিদারির দায়িত্ব রানী ভবানীর হাতে তুলে দেন। পরের চার দশকের বেশি সময় তিনি এই জমিদারি পরিচালনা করেন।
রানী ভবানী শুধু একজন শাসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন নির্মাতাও। তার সময়ে রাজবাড়ির পরিসর বাড়ে। মন্দির, অতিথিশালা, পুকুর আর রাস্তা তৈরি হয়। তিনি দেশের নানা জায়গায় মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। নাটোর থেকে বগুড়ার ভবানীপুর পর্যন্ত যে রাস্তা গেছে, তা এখনো রানী ভবানীর জঙ্গল নামে পরিচিত। তার অর্থে অনেক পুকুর আর সরাইখানা তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। কোনো কোনো বিবরণে বলা হয়, তিনি প্রায় ৩৮০টি মন্দির, অতিথিশালা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন। লোকমুখে তিনি ‘অর্থ অন্নপূর্ণা’ নামে পরিচিত হন, কারণ প্রজাদের খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তা করতেন বলে জানা যায়। তার মৃত্যুর পর দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণ জমিদারির দায়িত্ব নেন। পরে জমিদারি দুই ভাই বিশ্বনাথ আর শিবনাথের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এভাবেই বড় তরফ আর ছোট তরফের দুটি ধারা তৈরি হয়।
স্থাপত্য: পরিখা আর রোমান ধাঁচ
নাটোর রাজবাড়ির স্থাপত্য এক নজরে চেনা যায়। মূল প্রাসাদটি ক্লাসিক্যাল রোমান ধাঁচে তৈরি, সামনে বড় বারান্দা আর উঁচু থাম। প্রাসাদ এলাকা দুই স্তরের পরিখা দিয়ে ঘেরা ছিল। বাইরের পরিখা আর ভেতরের পরিখার মাঝখানে ছিল প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা। ভেতরে নয়টি ভবন ছিল বলে উল্লেখ আছে: বড় তরফের প্রাসাদ, ছোট তরফের প্রাসাদ, দুই তরফের কাছারি ভবন আর প্রহরী কক্ষ, রানী ভবন, অতিথিশালা আর মধু রানী ভবন। মুঘল, ইউরোপীয় আর দেশীয় বাঙালি স্থাপত্যের মিশ্রণ এখানে স্পষ্ট। মন্দিরগুলো সেই মিশ্রণের আরেকটি প্রমাণ। শ্যামসুন্দর মন্দির, আনন্দময়ী কালীবাড়ি আর তারকেশ্বর শিব মন্দির এখনো প্রাসাদ চত্বরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভূমিকম্প, ভাগাভাগি আর নতুন ব্যবহার
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে রাজবাড়ির অনেক ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। পরে কিছু ভবন আবার তৈরি করা হয়, কিছু আর ফেরেনি। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে রাজবাড়ির পুরোনো জীবন শেষ হয়ে যায়। ভবনগুলো একে একে নতুন কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। ছোট তরফের প্রাসাদ একসময় নাটোরের জজ কোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বড় তরফের প্রাসাদে এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় রয়েছে।
রাজবাড়ির আয়তন নিয়ে নানা বিবরণে নানা সংখ্যা পাওয়া যায়। পরিখার ভেতরে প্রাসাদ এলাকা প্রায় ৫০.৪২ একর বলে উল্লেখ আছে। কোনো কোনো বিবরণে পুরো এলাকা ১২০ একর বলা হয়। ভেতরে দুটি গভীর পুকুর আর পাঁচটি ছোট পুকুর আছে বলে জানা যায়।
পার্ক হিসেবে নতুন জীবন
১৯৮৬ সাল থেকে রাজবাড়ির মাঠ জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রানী ভবানী কেন্দ্রীয় পার্ক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়রা একে যুব পার্ক নামেও চেনেন। সকালে এখানে হাঁটতে আসেন শহরের মানুষ। বিকেলে আসে স্কুলের ছেলেমেয়েরা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাজবাড়ির একটি অংশের সংস্কারকাজও শুরু হয়েছে।
তবে সংরক্ষণের কাজ এখনো অনেক বাকি। জেলা প্রশাসন কিছু ভবনের যত্ন নিলেও বেশির ভাগ ভবনের অবস্থা ভালো নয়। পুরোনো ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কিছু অংশে গাছপালা গজিয়ে উঠেছে। একটি রাজবাড়ি শুধু ভবন দিয়ে টিকে থাকে না। তার জন্য নিয়মিত সংস্কার, সঠিক তত্ত্বাবধান আর দর্শনার্থীদের আগ্রহ দরকার।
ঢাকা থেকে নাটোর যাওয়া এখন সহজ। সড়কপথে কয়েক ঘণ্টার যাত্রা, রেলপথেও যাওয়া যায়। সকালের দিকে গেলে প্রাসাদ চত্বর ঘুরে দেখা যায় শান্তিতে। পাশেই রয়েছে উত্তরা গণভবন, যা একদিনের ভ্রমণে একসঙ্গে দেখে নেওয়া যায়। শীতের সকালে পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কেন এই জায়গাটি নাটোরের মানুষের কাছে এত প্রিয়।
নাটোর রাজবাড়ি দেখতে যাওয়া মানে শুধু পুরোনো ভবন দেখা নয়। এটি বাংলার অষ্টাদশ শতকের ইতিহাসের ভেতরে হাঁটা। এখানে দাঁড়িয়ে ভাবা যায়, একজন নারী কীভাবে চার দশক ধরে বাংলার অন্যতম বড় জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন। সেই গল্পই এই প্রাসাদকে শুধু একটি পর্যটনস্থল থেকে আলাদা করে। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ। আর সেই ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।
ছবি বিষয়ে নোট: এই প্রতিবেদনের সব ছবি মূল চিত্রায়ণ, পুরোনো আলোকচিত্র নয়।


