খুলনা শহরে এখন নতুন ভবনের কাজ চোখে পড়ে। সোনাডাঙার রাস্তায়, বয়রার গলিতে, খালিশপুরের পুরোনো মহল্লায়, নতুন অ্যাপার্টমেন্ট উঠছে। ঢাকার মতো ভিড় এখানে নেই। তবু ফ্ল্যাটের খোঁজ বাড়ছে। শহরে চাকরি করা মানুষ, ব্যবসায়ী পরিবার, আর বিদেশে থাকা খুলনার মানুষ, তাঁরা সবাই শহরে একটি নিজের ঠিকানা চাইছেন।
খুলনা নদীবন্দর শহর। রূপসা আর ভৈরব নদীর কাছে এই শহরের জীবন গড়ে উঠেছে বাণিজ্য আর শিল্প ঘিরে। খালিশপুরের শিল্পাঞ্চল, মংলা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ, আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা শহর হিসেবে খুলনার গুরুত্ব, এসব মিলে শহরটির আবাসনের চাহিদা তৈরি করেছে। ঢাকার তুলনায় এখানে জমির চাপ কম। সেই কারণে ফ্ল্যাটের আকারও এখানে কিছুটা বড় পাওয়া যায়, আর ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা থাকে।
কোথায় খোঁজ বেশি
সোনাডাঙা এখন খুলনার সবচেয়ে পরিচিত আবাসিক এলাকা। এখানে স্কুল, বাজার, হাসপাতাল আর শহরের মূল সড়কের সঙ্গে যোগাযোগ, সবই হাতের কাছে। বয়রা আর নিরালা এলাকায় নতুন ভবন উঠছে, যেখানে পরিবার নিয়ে থাকতে চান তাঁরা খোঁজ নিচ্ছেন। খালিশপুরে শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি থাকায় সেখানকার ফ্ল্যাটে চাকরিজীবীদের আগ্রহ বেশি। শহরের বাইরের দিকে, সাতক্ষীরা সড়ক ধরে, নতুন প্লট আর ভবনের কাজও চোখে পড়ছে।
এলাকা বাছাইয়ের সময় শুধু ভবন দেখলে চলবে না। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ আর রাস্তার অবস্থা দেখতে হবে। বর্ষায় কোন এলাকায় পানি জমে, সেটা স্থানীয়দের কাছে জানা যায়। খুলনায় নদীর কাছাকাছি এলাকায় এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভবনের লিফট, জেনারেটর আর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দেখে নেওয়া ভালো। নতুন ভবনে এসব সুবিধা থাকলেও পুরোনো ভবনে অনেক সময় থাকে না।
কেনার আগে যা যাচাই করবেন
খুলনায় ফ্ল্যাট কেনার আগে কাগজপত্র যাচাই করা ঢাকার মতোই জরুরি। জমির খতিয়ান, মিউটেশন, ভবনের অনুমোদন আর ডেভেলপারের আগের কাজের রেকর্ড, এসব দেখে নেওয়া উচিত। শহরে এখন অনেক ছোট ডেভেলপার কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে ভালো কাজের রেকর্ড আছে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে, আবার নতুনরাও আছে। আগের হস্তান্তর করা ভবন দেখে নিলে কাজের মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
দাম নিয়ে কথা বলার সময় দরদাম করা স্বাভাবিক। খুলনায় ফ্ল্যাটের দাম এলাকা, ভবনের মান আর সুবিধার উপর নির্ভর করে অনেকটাই বদলায়। কোনো নির্দিষ্ট দাম না জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কয়েকটি ভবন ঘুরে দেখে, একই এলাকার কয়েকটি ফ্ল্যাটের দাম মিলিয়ে নিলে বাজারের ধারণা পরিষ্কার হয়। ব্যাংক থেকে হোম লোন নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। লোনের শর্ত আর কিস্তির হিসাব আগেই জেনে নেওয়া ভালো।
প্রবাসী আর ভাড়ার চাহিদা
খুলনার ফ্ল্যাটের চাহিদার একটি বড় অংশ আসে প্রবাস থেকে। বিদেশে থাকা খুলনার মানুষ শহরে একটি ফ্ল্যাট কিনে রাখতে চান, যাতে দেশে ফিরলে থাকার জায়গা থাকে, আর না থাকলে ভাড়া দেওয়া যায়। খুলনায় চাকরি আর পড়াশোনার জন্য আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে, তাই ভাড়ার চাহিদাও আছে। একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় তাই শুধু নিজে থাকার কথা নয়, ভাড়া দেওয়ার সম্ভাবনাও মাথায় রাখা ভালো। যে এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল আর বাজার কাছে, সেখানে ভাড়াটে পাওয়া সহজ হয়।
শহরের ভবিষ্যৎ
খুলনার আবাসন বাজারের ভবিষ্যৎ শহরের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মংলা বন্দর, খুলনার শিল্প আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ যত বাড়বে, শহরে থাকার চাহিদাও তত বাড়বে। নতুন ফ্ল্যাটের পাশাপাশি পুরোনো মহল্লাগুলোতেও সংস্কারের কাজ হচ্ছে। শহরের মানুষ চাইছেন, খুলনা যেন ঢাকার মতো ভিড় আর যানজটের শহর না হয়ে ওঠে।
সেই আশা পূরণের জন্য পরিকল্পিত ভবন দরকার। খোলা জায়গা রেখে, রাস্তা আর নর্দমার ব্যবস্থা ঠিক রেখে ভবন উঠলে শহর ভালো থাকবে। খুলনার আবাসন এখন সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নতুন ভবন উঠছে, আর শহরের মানুষ ঠিক করছেন, তাঁদের শহর কেমন হবে। একটি ফ্ল্যাট কেনা তাই শুধু একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত নয়। এটি শহরের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।


