সন্ধ্যা নামছে হাতিরঝিলে। লেকের পানিতে সেতুর আলো কাঁপছে। হাঁটার পথে ভিড় বাড়ছে। একদিকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা মানুষ, অন্যদিকে সকালের হাঁটা শেষ করে ফেরার পথে বয়স্করা। কেউ বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছে, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে। ঢাকার মাঝখানে এত বড় খোলা জায়গা আর পানি, এই দৃশ্য আজ স্বাভাবিক মনে হয়। বারো বছর আগে এখানে ছিল অন্য এক ঢাকা।
হাতিরঝিলের গল্প শুরু হয় বেগুনবাড়ি খাল দিয়ে। একসময় এখানে ছিল জলাভূমি আর খাল, ঢাকার পূর্ব আর পশ্চিমকে যুক্ত করা পানির পথ। কথিত আছে, ঢাকার পিলখানার হাতিগুলোকে এই জলাভূমিতে গোসল করাতে আনা হতো, আর সেখান থেকেই নাম হাতিরঝিল। এটি লোককথা, তবে নামের সঙ্গে শহরের পুরোনো দিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সময়ের সঙ্গে খাল দখল হলো, পানি দূষিত হলো, আর জায়গাটি ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে হয়ে উঠল এক দুর্ভোগের নাম।
জলাভূমি থেকে লেকপাড়
২০০৭ সালে একনেকে অনুমোদন পায় হাতিরঝিল আর বেগুনবাড়ি খালের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। কাজের নেতৃত্বে ছিলেন স্থপতি ইকবাল হাবিব আর তাঁর প্রতিষ্ঠান ভিট্টি স্থপতি বৃন্দ। পরিকল্পনা শুধু রাস্তা বানানোর ছিল না। খালের পানি ধরে রাখা, বৃষ্টির পানি জমার ব্যবস্থা, নর্দমা আর পূর্ব-পশ্চিম ঢাকার মধ্যে যোগাযোগ, সব একসঙ্গে ভাবা হয়েছিল। প্রায় ছয় বছরের কাজের পর ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি প্রকল্পটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
প্রকল্পের আকার শুনলে বোঝা যায় কাজটি কত বড় ছিল। প্রায় ৩০২ একর জায়গা, লেকের চারপাশে প্রায় ১৬ কিলোমিটার সড়ক, ৯ কিলোমিটার ফুটপাত আর ১০ কিলোমিটার লেকপাড়ের হাঁটার পথ। চারটি বড় সেতু আর কয়েকটি ছোট সেতু পানির উপর দিয়ে পাড়ি দিয়েছে। তেজগাঁও, গুলশান, মগবাজার, বাড্ডা আর রামপুরার মাঝখানে এই লেক এখন শহরের মানচিত্রের একটি স্থায়ী অংশ।
শহরের মানুষের জায়গা
হাতিরঝিলের আসল সাফল্য তার রাস্তায় নয়, তার ব্যবহারে। সকালে এখানে হাঁটতে আসেন আশপাশের মহল্লার মানুষ। তেজগাঁওয়ের শ্রমিক, মগবাজারের দোকানদার, বাড্ডার ছাত্র, সবাই একই পথে হাঁটেন। বিকেলে আসে পরিবার। শিশুরা লেকের ধারে দৌড়ায়, তরুণেরা ছবি তোলে, বয়স্করা বেঞ্চে বসে গল্প করেন। ঢাকায় এমন জায়গা কম, যেখানে টাকা না খরচ করে পরিবার নিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটানো যায়।
লেকপাড়ের বাড়িগুলোর কাছেও এই জায়গার মূল্য আলাদা। গুলশান, নিকেতন আর বনশ্রীর ফ্ল্যাটের জানালা থেকে লেক দেখা যায়। আশপাশের এলাকায় যাঁরা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তাঁদের অনেকের কাছে হাতিরঝিলের কাছাকাছি থাকা একটি বাড়তি সুবিধা। তবে এই সুবিধার আসল মালিক শুধু পাশের বাড়ির মানুষ নন। পুরো শহরের মানুষ এখানে আসে, আর সেটাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন।
যাতায়াতেরও পথ
হাতিরঝিল শুধু বেড়ানোর জায়গা নয়, যাতায়াতের পথও। মগবাজার থেকে রামপুরা যাওয়ার জন্য লেকের পাশের সড়ক অনেকের কাছে এখন স্বাভাবিক পথ। একসময় এই পথে যেতে হলে ঘুরে যেতে হতো, এখন লেকের ধার ধরে সোজা যাওয়া যায়। পানিতে নৌকা আর ওয়াটার ট্যাক্সির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল, যাতে সড়কের চাপ কমে। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়েছে কি না, তা নিয়ে কথা আছে, তবে লেক যে শহরের যাতায়াতে একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
স্বীকৃতি আর দায়িত্ব
২০২৫ সালে হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প এশিয়ান টাউনস্কেপ পুরস্কার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি ঢাকার জন্য গর্বের। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, জায়গাটি ধরে রাখার দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। লেকের পানির পরিচ্ছন্নতা, হাঁটার পথের রক্ষণাবেক্ষণ, আলো আর নিরাপত্তা, এসব নিয়ে শহরের মানুষের অভিযোগ মাঝে মাঝেই ওঠে। একটি বড় প্রকল্প বানানো এক কথা, আর তেরো বছর ধরে তাকে ভালো রাখা আরেক কথা।
হাতিরঝিলের পর ঢাকায় এমন আরেকটি জলাভূমি উন্নয়ন প্রকল্প আর হয়নি। সেই অর্থে এই লেক এখনো শহরের কাছে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। জলাভূমি রক্ষা করে, পানির পথ ফিরিয়ে এনে আর মানুষের হাঁটার জায়গা বানিয়ে একটি শহর কতটা বদলাতে পারে, হাতিরঝিল তার প্রমাণ। প্রশ্ন শুধু এটাই, ঢাকা এই শিক্ষা থেকে আর কত জায়গায় এমন কাজ করতে পারবে।
সন্ধ্যার আলো নিভে গেলে লেকপাড়ে ভিড় কমে। সেতুর আলো পানিতে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ আগে যে শিশুটি দৌড়াচ্ছিল, সে এখন বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাতিরঝিলের দিন শেষ হয় এভাবেই, শান্তভাবে। আর আগামীকাল সকালে আবার হাঁটার পথে মানুষ নামবে, আবার লেকের পানি রোদে ঝলমল করবে। ঢাকার এই লেকপাড় এখন শহরের জীবনের অংশ, আর শহরের জীবন তার কাছে ঋণী।




