চট্টগ্রামের কারখানায় লোহার রড তৈরি হয় দিনরাত। ঢাকার নির্মাণাধীন ভবনের সামনে রডের স্তূপ দেখলে বোঝা যায়, এই শিল্প ছাড়া শহরের একটা ভবনও দাঁড়ায় না। বাংলাদেশের ইস্পাতের বাজারে বিএসআরএমের নামটা তাই শুধু একটা কোম্পানির নাম নয়, পুরো নির্মাণ খরচের একটা সূচক।
২০২৬ অর্থবছরে, যা শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন, বিএসআরএম লিমিটেডের একীভূত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭০৩ কোটি টাকা। আগের বছরের ৬১৪ কোটি টাকার তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানির আয় দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা, আগের বছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে হয়েছে ২৩ টাকা ৫৪ পয়সা, আগের বছরে যা ছিল ২০ টাকা ৫৭ পয়সা। কোম্পানি ৫৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের সুপারিশ করেছে।
সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম স্টিলসের ফলাফল আরও চমকপ্রদ। প্রতিষ্ঠানটির আয় ১২ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, নিট মুনাফা ৭১৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি। শেয়ারপ্রতি আয় ১৯ টাকা ৩ পয়সা, আগের বছরে ছিল ১৩ টাকা ৭৭ পয়সা। এই প্রতিষ্ঠান ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেবে। দুই কোম্পানি মিলিয়ে মোট আয় ২৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, মুনাফা ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।
বাজারের এক চতুর্থাংশ যার হাতে
বিএসআরএম দেশের ইস্পাত চাহিদার প্রায় এক চতুর্থাংশ সরবরাহ করে। দেশের ইস্পাত শিল্পের আকার প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বলে ধরা হয়। তাই বিএসআরএমের ফলাফল শুধু একটা কোম্পানির হিসাব নয়, পুরো শিল্পের স্বাস্থ্যের খবর। কোম্পানির আয় ও মুনাফা একসঙ্গে বাড়ার মানে, সারা দেশে নির্মাণকাজ চলছে, রডের চাহিদা আছে, আর কোম্পানি সেই চাহিদা মেটাতে পারছে।
এই খবর ফ্ল্যাট কিনতে চাওয়া মানুষের জন্য দুভাবে পড়া যায়। একদিকে, ইস্পাত কোম্পানির ভালো ফলাফল মানে নির্মাণ খাত সচল। ভবন তৈরি হচ্ছে, কাজ চলছে, সরবরাহ ঠিক আছে। অন্যদিকে, কোম্পানির মুনাফা বাড়ার পেছনে দামও একটা কারণ হতে পারে। রডের দাম বাড়লে কোম্পানির আয় বাড়ে, কিন্তু ডেভেলপারের খরচও বাড়ে। সেই খরচ শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দামে গিয়ে পড়ে কি না, সেটাই ক্রেতার আসল প্রশ্ন।
খরচের চাপ কোথা থেকে আসে
নির্মাণ খরচ শুধু রডের দামে ঠিক হয় না। সিমেন্ট, বালু, ইট, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি, পরিবহন, সব মিলিয়ে খরচের হিসাব। রডের দাম বাড়লে ডেভেলপার প্রথমে নিজের মুনাফায় চাপ সইতে চায়। কিন্তু চাপ বাড়তে থাকলে নতুন প্রকল্পের দামে তার ছাপ পড়ে। পুরনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে যাঁরা আগেই বুকিং দিয়েছেন, তাঁদের চুক্তি অনুযায়ী দাম সাধারণত বদলায় না। নতুন ক্রেতারাই দামের ওঠানামা সবচেয়ে বেশি টের পান।
বিএসআরএমের রেকর্ড তারিখও মনে রাখার মতো। লভ্যাংশ পাওয়ার রেকর্ড তারিখ ১৫ নভেম্বর। বার্ষিক সাধারণ সভা ১৭ ডিসেম্বর। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির ফলাফল তাই শুধু নির্মাণ খাতের খবর নয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেতার জন্য হিসাবটা কী
ফ্ল্যাট কিনতে চাওয়া একজন ক্রেতার জন্য বার্তাটা সহজ। নির্মাণ খাত এখন সচল, বড় কোম্পানিগুলো মুনাফা করছে, সরবরাহে বড় কোনো সংকটের খবর নেই। তবে খরচের চাপ আছে, আর সেটা নজরে রাখা ভালো। বুকিং দেওয়ার আগে প্রকল্পের নির্মাণের অগ্রগতি দেখা, কোন পর্যায়ে আছে সেটা বোঝা, আর দামে কী কী ধরা আছে সেটা লিখিতভাবে জানা, এই তিনটিই এখন আরও জরুরি।
ইস্পাতের এই রেকর্ড বছর তাই একটা সংকেত। নির্মাণ খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, চাহিদা ফিরছে, বড় কোম্পানিগুলো লাভে আছে। ফ্ল্যাটের বাজারে এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা যাবে, একদিনে নয়।
শেয়ারবাজারে এর প্রতিফলন
বিএসআরএমের ফলাফল শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছেও খবর। কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৮৬ টাকা ৬ পয়সা, আগের বছরে যা ছিল ১৬৬ টাকা ৭৯ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানির সম্পদের ভিত্তিও মজবুত হয়েছে। লভ্যাংশের রেকর্ড তারিখ ১৫ নভেম্বর, আর বার্ষিক সাধারণ সভা বসবে ১৭ ডিসেম্বর।
ইস্পাত খাতের এই অগ্রগতি পুরো নির্মাণ শিল্পের জন্য একটা ভালো সংকেত। সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, সবকিছুর চাহিদা একসঙ্গে বাড়লে বোঝা যায়, দেশে ভবন তৈরি হচ্ছে, মানুষ ঘর কিনছে, ডেভেলপাররা নতুন প্রকল্প শুরু করছে। তবে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচের দিকেও নজর রাখতে হয়। কাঁচামালের দাম, জ্বালানির খরচ, পরিবহন ব্যয়, সবকিছু মিলিয়ে নির্মাণ খরচের হিসাব ঠিক হয়। একজন ক্রেতা হিসেবে এই খবরগুলো জানা থাকলে দাম নিয়ে আলোচনা করার সময় সুবিধা হয়।


