রাজশাহী শহরের পরিচয়টা আলাদা। পদ্মার পাড়ের এই শহরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর দেশের নানা জেলা থেকে ছাত্রছাত্রীরা এখানে পড়তে আসে। তাঁদের থাকার জায়গার চাহিদা থেকেই শহরের আবাসনের বড় একটা অংশ গড়ে উঠেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রটা সংখ্যায় চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন সেখানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। তাঁদের জন্য রয়েছে ১৭টি আবাসিক হল আর একটি আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস। সব মিলিয়ে হলে থাকার জায়গা মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ জনের। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হয়।

হলের ভাড়া মাত্র ১০০ টাকা। বাইরে থাকতে গেলে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এই ব্যবধানটাই বলে দেয়, কেন হলের একটা সিটের জন্য এত চাপ। মেয়েদের হলগুলোতে চাপটা আরও বেশি।

Estate News — Find your dream home

নতুন হল, নতুন আশা

এই সংকটের কথা মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছয়টি নতুন হল বানানোর পরিকল্পনা করেছে। তিনটি ছেলেদের আর তিনটি মেয়েদের। এই পরিকল্পনার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অনুমোদন পেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে তিন বছরে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন হলগুলোতে সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর থাকার জায়গা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এর আগেও দুটি নতুন হলের কাজ চলছিল। শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হল আর একটি মেয়েদের হল। কামারুজ্জামান হলের কাজ প্রায় শেষের দিকে ছিল বলে ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। সেখানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা হবে।

হলের জায়গা বাড়লে শহরের ভাড়া বাসার চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা যায়। তবে সেটা সময়ের ব্যাপার। নতুন হলগুলো তৈরি হতে কয়েক বছর লাগবে। ততদিন শহরের মেস, ভাড়া বাসা আর ছোট ফ্ল্যাটই শিক্ষার্থীদের ভরসা।

পরিবারের ফ্ল্যাটের দিকে নজর

শিক্ষার্থীদের বাইরেও রাজশাহীতে আরেকটা চাহিদা বাড়ছে। ছেলেমেয়ে রাজশাহীতে পড়ে, এমন অনেক পরিবার এখন শহরে একটা ফ্ল্যাট কিনে রাখার কথা ভাবছে। সন্তান পড়ার সময় থাকবে, পরে পরিবার এলে সেই ফ্ল্যাট কাজে লাগবে। এই ভাবনা থেকেই উপশহর আবাসিক এলাকা, পদ্মা আবাসিক এলাকাসহ শহরের আবাসিক পাড়াগুলোতে ফ্ল্যাটের খোঁজ বাড়ছে।

Advertise on Estate News

স্থানীয় ডেভেলপাররাও এই চাহিদা দেখছে। উপশহর এলাকায় রাঙ্গাপরি ডেভেলপার্সের মতো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আমবাগান এলাকায় চৌধুরী স্কাই লাউঞ্জ নামে একটা প্রকল্প হস্তান্তরের কাছাকাছি রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে জানা গেছে। ছোট শহরে বড় প্রকল্পের খবর এখনো কম, তবে ধাপে ধাপে নতুন ভবন উঠছে।

ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে রাজশাহীর ক্রেতাদের ভাবনাটা ঢাকার চেয়ে আলাদা। এখানে অনেকে প্রথমে ভাড়া থেকে দেখেন, এলাকাটা কেমন, স্কুল-বাজার কত দূরে, তারপর কেনার সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা, হাসপাতালের আশপাশ আর নদীর পাড়ের এলাকাগুলো পরিবারগুলোর পছন্দের তালিকায় থাকে।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শহরের ভাড়া বাজারের বড় অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক, চিকিৎসক আর সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারও শহরে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজছে। সব মিলিয়ে রাজশাহীর আবাসনের চাহিদাটা শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে এই চাহিদা তৈরি করেছে।

শহরের পুরোনো পাড়াগুলোতে এখনো অনেক একতলা আর দোতলা বাড়ি আছে। নতুন ভবন উঠছে মূলত আবাসিক এলাকাগুলোতে। যাঁরা ফ্ল্যাট কিনতে চান, তাঁদের সামনে দুটো পথ। এক, নতুন ভবনে তৈরি ফ্ল্যাট কেনা। দুই, পুরোনো বাড়ি কিনে নিজের মতো করে সাজানো। দুটো পথেই কাগজপত্রের যাচাইটা সবচেয়ে জরুরি। জমির দলিল, খতিয়ান, মিউটেশন আর ভবনের অনুমোদন না দেখে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

ভাড়া বনাম নিজের ঠিকানা

শিক্ষার্থীদের ভাড়া বাসার চাহিদা এখানে নিয়মিত। মেস ভাড়া, ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া আর পারিবারিক বাসা, তিন ধরনের চাহিদাই শহরে রয়েছে।

পরিবারগুলোর জন্য পরামর্শ একটাই। ফ্ল্যাট কিনতে গেলে কাগজপত্র যাচাই করে নেওয়া, জমির মালিকানা আর অনুমোদন দেখে নেওয়া, আর ভবনের নির্মাণের মান নিজে গিয়ে দেখা। ছোট শহরে পরিচিত ডেভেলপারের কাজের ইতিহাস জানা তুলনামূলক সহজ, আর সেটাই এখানকার বড় সুবিধা।

যাতায়াতের দিক থেকেও রাজশাহী অন্য শহরের চেয়ে শান্ত। রিকশা আর অটোরিকশায় শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া যায়। পদ্মার পাড়ে বিকেলের হাওয়া খেতে যাওয়া এখানকার মানুষের পুরোনো অভ্যাস। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সাহেববাজার আর উপশহর, এই তিন জায়গার আশপাশেই বেশিরভাগ পরিবার থাকতে চায়। যাঁরা ফ্ল্যাট খুঁজছেন, তাঁদের কাছে এই তিন এলাকার নামই সবার আগে আসে।

রাজশাহী এখনো ঢাকার মতো দ্রুত বদলানো শহর নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আসছে, নতুন হল হচ্ছে, আর পরিবারগুলো নিজের ঠিকানার খোঁজ করছে। এই তিন ধারা মিলেই রাজশাহীর আবাসনের আগামী দিনের গল্পটা লেখা হচ্ছে।