বাড়ি বানানোর সময় সবাই প্রথমে ভাবে ছাদ, ইট, রড আর সিমেন্টের কথা। কিন্তু বাড়ি যখন দাঁড়িয়ে যায়, তখন শুরু হয় আরেক হিসাব। দেয়ালে রং, বাথরুমে বেসিন আর কমোড, রান্নাঘরে সিংক, দরজায় ফিটিংস। এই শেষ ধাপটাই অনেক পরিবারের বাজেট এলোমেলো করে দেয়। কারণ এখানে পছন্দ অনেক, দামের পার্থক্য অনেক, আর ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় বছরের পর বছর।

রং দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের বাজারে বার্জার পেইন্টস সবচেয়ে পরিচিত নাম। এশিয়ান পেইন্টস, নিপ্পন পেইন্ট, কানসাই নেরোলাক আর এলিট পেইন্টসও বাজারে আছে। বার্জারের লাক্সারি সিল্ক, এশিয়ান পেইন্টসের রয়্যাল, এই নামগুলো দোকানে গেলেই শোনা যায়। ভেতরের দেয়ালের জন্য ইমালশন, বাইরের দেয়ালের জন্য ওয়েদারকোট, এটাই সাধারণ ভাগ। কিন্তু রঙের দাম শুধু ড্রামের দাম নয়। এর সঙ্গে আছে পুটি, প্রাইমার, ব্রাশ, রোলার আর মিস্ত্রির মজুরি। দেয়াল ভালো করে না ঘষলে, পুটি ঠিকমতো না দিলে, দামি রংও দুই বছরে নষ্ট হয়।

কোথায় খরচ বাড়ে

Estate News — Find your dream home

খরচ বাড়ে মূলত তিন জায়গায়। প্রথমত, রঙের ধরন। সাধারণ ডিসটেম্পার আর প্রিমিয়াম ইমালশনের দামে অনেক পার্থক্য। দ্বিতীয়ত, রঙের সংখ্যা। প্রতি ঘরে আলাদা রং, বাচ্চার ঘরে এক রং, বসার ঘরে আরেক রং, এই পছন্দ বাজেট বাড়ায়। তৃতীয়ত, মিস্ত্রির কাজ। ভালো মিস্ত্রি বেশি মজুরি নেন, কিন্তু কাজ টেকে। কম মজুরিতে কাজ করিয়ে পরে আবার রং করতে হলে খরচ দ্বিগুণ হয়।

স্যানিটারির হিসাব আরও জটিল। ঢাকার হাতিরপুল আর এলিফ্যান্ট রোডে গেলে বেসিন আর সিংকের দোকান সারি সারি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিল, স্টেইনলেস স্টিলের সিংকের দাম কয়েক হাজার টাকা থেকে প্রায় ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত। দেশে তৈরি সিরামিক বেসিন, যেমন আকিজ, রোসা আর র‍্যাক, কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। বিদেশি ব্র্যান্ড, যেমন কোহলার, রোকা, সুইশ আর আইডিয়াল স্ট্যান্ডার্ড, ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। এই দামগুলো ২০২৩ সালের প্রকাশিত হিসাব। এখনকার দাম জানতে হলে দোকানে যাচাই করতে হবে।

ব্র্যান্ড আর মানের ফারাক

Estate News free property calculators

র‍্যাক সিরামিকস বাংলাদেশের বাজারে বড় নাম। কোম্পানিটি ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করে। গাজীপুরে এর কারখানা। সারা দেশে ৩০০টি বিক্রয়কেন্দ্র আর ১৫০ জন ডিলার ও সাব-ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হয়। টাইলস আর স্যানিটারিওয়্যার, দুটোতেই কোম্পানির উপস্থিতি আছে। তবে ব্র্যান্ডের নামই সব নয়। বেসিন কেনার সময় দেখতে হবে মাটির মান, গ্লেজের মসৃণতা, পানি যাওয়ার পথ, আর ফিটিংসের মান। সস্তা বেসিনে দাগ বসে যায়। সস্তা কল কিছুদিন পর পানি চোঁয়াতে শুরু করে।

রং আর স্যানিটারি, দুটোতেই সবচেয়ে বড় ভুল হয় তাড়াহুড়ো। বাড়ির মালিকরা শেষ মুহূর্তে এসে বলেন, যেকোনো একটা লাগিয়ে দিন। মিস্ত্রি তখন হাতের কাছে যা পান, তাই লাগান। পরে দেখা যায়, বাথরুমের টাইলসের সঙ্গে বেসিনের রং মেলে না। রান্নাঘরের সিংক ছোট হয়ে গেছে। দেয়ালের রং আলোতে এক রকম, রাতে আরেক রকম। এই ভুল এড়াতে রং আর স্যানিটারি কেনার আগে নমুনা দেখা দরকার। দোকানের আলোতে নয়, বাড়ির আলোতে রঙের নমুনা দেখুন। বেসিনের আকার মেপে নিন। পানির চাপ কেমন, সেটা জেনে কল কিনুন।

বাজেটের সহজ নিয়ম

একটা সহজ নিয়ম কাজে লাগে। রং আর স্যানিটারির জন্য আলাদা বাজেট রাখুন। কাঠামোর খরচের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলবেন না। দোকানে যাওয়ার আগে তালিকা করুন। কোন ঘরে কয়টা বেসিন, কোন বাথরুমে কী ধরনের কমোড, রান্নাঘরে সিংক কত বড়, সব লিখে নিন। দোকানে গিয়ে দাম যাচাই করুন। দুই-তিনটা দোকানে দাম জিজ্ঞেস করুন। অনলাইনে দাম দেখে দোকানের দামের সঙ্গে মেলান।

আরেকটা কথা। দোকান ভেদে, এলাকা ভেদে আর সময় ভেদে দাম বদলে যায়, তাই ব্র্যান্ডের নাম, দামের সীমা আর কেনার নিয়ম দেওয়া হলো। বাকিটা দোকানে গিয়ে যাচাই করতে হবে।

বাড়ি বানানো শেষ হয় রং আর স্যানিটারিতে। এই ধাপটা ঠিকমতো হলে বাড়ি দেখতে ভালো লাগে, থাকতে আরাম হয়। ভুল হলে প্রতিদিন চোখে পড়ে। তাই শেষ ধাপে তাড়াহুড়ো নয়। সময় নিয়ে, দেখে শুনে, যাচাই করে কিনুন। বাড়ি একবার বানানো হয়। রং আর বেসিন বদলানো যায়, কিন্তু সেই খরচ আর ঝামেলা এড়ানোই ভালো।