সাভারের সকাল শুরু হয় কারখানার সাইরেন আর বাসের হর্নে। হাজারো শ্রমিক, কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ী একই সময়ে রাস্তায় নামেন। কেউ যান ঢাকার দিকে, কেউ আসেন আশুলিয়া, জিরাবো আর সাভারের কারখানাগুলোতে। বর্তমান সড়কে এই চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সেই চাপ কমানোর লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে, ঢাকার সঙ্গে সাভার-আশুলিয়া করিডরের সংযোগ আরও সরাসরি করার জন্য।
উড়াল সড়কের কাজের চিত্র এখন চোখে পড়ে। পিলার উঠেছে, কোথাও ডেকের অংশ বসেছে, নিচের সড়কে চলছে বাস, ট্রাক, রিকশা আর ভ্যান। নির্মাণ চলাকালীন যাতায়াতে অসুবিধা হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ধুলো, সরু হয়ে যাওয়া রাস্তা আর ধীরগতির যানবাহন এখন এই এলাকার মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। কিন্তু যাঁরা প্রতিদিন এই পথে চলাচল করেন, তাঁদের চোখ থাকে শেষের দিকে: কাজ শেষ হলে যাত্রাটা কেমন হবে।
কারখানা এলাকার যাতায়াত
আশুলিয়া ও সাভারের কারখানা এলাকায় সময়ের হিসাব খুব কড়া। শিফট শুরু হয় নির্দিষ্ট সময়ে, আর দেরি হলে তার মূল্য দিতে হয় শ্রমিককে। বাস মালিকদের জন্যও সময়ের অনিশ্চয়তা একটা বড় খরচ। উড়াল সড়ক চালু হলে ঢাকার দিক থেকে আসা যানবাহন নিচের সড়কের জ্যাম এড়িয়ে চলতে পারবে। এর ফলে সাভার থেকে ঢাকায় যাওয়া, আর ঢাকা থেকে সাভারে ফেরা, দুটো যাত্রাই অনুমেয় হতে পারে।
এই অনুমেয় সময়ের মূল্য শুধু কারখানার শ্রমিকদের জন্য নয়। সাভারে থাকেন এমন শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যাংক কর্মকর্তা আর ছোট ব্যবসায়ীরাও ঢাকার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ছেলেমেয়েদের ঢাকার কলেজে যাওয়া, হাসপাতালে যাওয়া, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া: সবকিছুতেই যাত্রার সময় একটা সিদ্ধান্তের বিষয়।
পরিবারগুলো কোথায় থাকতে চাইবে
সাভার ও আশুলিয়ায় পরিবার নিয়ে থাকার ধরন ঢাকার ভেতরের চেয়ে আলাদা। এখানে অনেকে কিছুটা বড় ফ্ল্যাট বা বাড়ি খোঁজেন, যেখানে বাচ্চাদের খেলার জায়গা থাকে আর বাজার, স্কুল, মসজিদ কাছাকাছি থাকে। কারখানার কাছাকাছি থাকা সুবিধা, কিন্তু কোলাহল আর ধুলো থেকে কিছুটা দূরে থাকাও চান অনেকে।
যোগাযোগ ভালো হলে পরিবারের হিসাব বদলায়। সাভারের ভেতরে যাঁরা থাকেন, তাঁরা ঢাকার কাজের সুযোগের কথা ভেবে এলাকায় থাকতে পারেন। আবার ঢাকায় যাঁরা থাকেন, তাঁদের কেউ কেউ সাভারের দিকে বড় ফ্ল্যাটের কথা ভাবতে পারেন, যদি যাতায়াতটা নির্ভরযোগ্য হয়। এই সিদ্ধান্তে দামের প্রশ্নও আসে, কিন্তু দাম নিয়ে আগাম কোনো দাবি করা ঠিক হবে না। বাড়িভাড়া আর ফ্ল্যাটের দাম নির্ভর করে ভবনের মান, রাস্তার অবস্থা, পানি-গ্যাসের সরবরাহ আর এলাকার সার্বিক বাজারের ওপর।
যা এখনো ঠিক হতে হবে
উড়াল সড়ক একা সব সমস্যার সমাধান নয়। নিচের সড়ক, ফুটপাত, বাস স্ট্যান্ড আর রিকশার চলাচল ঠিক না হলে উড়াল সড়কের সুবিধা অর্ধেক থেকে যাবে। সাভার বাজার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা আর আশুলিয়ার মোড়গুলোতে নামা-ওঠার ব্যবস্থা পরিষ্কার হওয়া দরকার। রাতে আলো, নিরাপদ পারাপার আর সাইনবোর্ড: এই ছোট বিষয়গুলোই ঠিক করে দেবে, পথটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা কাজে লাগবে।
সাভার-আশুলিয়ার মানুষের জন্য এই এক্সপ্রেসওয়ের আসল পরীক্ষা হবে প্রথম সকালে, যখন একজন শ্রমিক সময়মতো কারখানায় পৌঁছাবেন, একজন মা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে কাজে যাবেন, আর একটি পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে, এই এলাকাতেই তাদের আগামী বছরগুলো কাটবে।




