১ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে অক্টোবর মাসের ছবিটা বেশ পরিষ্কার। রপ্তানি বেড়েছে, রেমিট্যান্সও বেড়েছে। দুটো সংখ্যা একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বাইরে থেকে দেশে টাকা আসার দুটি বড় পথই এখন সচল আছে। এই খবরটা শুধু অর্থনীতির পাতার জন্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারখানার শ্রমিকের বেতন, প্রবাসী পরিবারের মাসের হিসাব, আর ঢাকা বা জেলা শহরে ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন।

রপ্তানি প্রসঙ্গে প্রথম সংখ্যাটা হলো অক্টোবরের ৩৯৯ কোটি ডলার। গত বছরের একই মাসে এই অঙ্ক ছিল ৩৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরের হিসাবে বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ। টানা তৃতীয় মাসের মতো রপ্তানি বাড়ল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যের বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এই খবর জানিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাস, জুলাই থেকে অক্টোবর, মিলিয়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৭০৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬০৮ কোটি ডলার। বৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ, টাকার হিসাবে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার বেশি।

তৈরি পোশাকই এখনো ভরসা, সঙ্গে অন্য খাত

Estate News — Find your dream home

এই বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তৈরি পোশাকের। নিটওয়্যার রপ্তানি বছরের হিসাবে ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭৭১ কোটি ডলার। ওভেন পোশাক বেড়ে হয়েছে ৬০০ কোটি ডলার, বৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশ। এর সঙ্গে ওষুধ, পাট আর চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিও ভালো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থাৎ গল্পটা শুধু একটা খাতের নয়, যদিও পোশাকের ওজনই সবচেয়ে বেশি।

গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ আর চট্টগ্রামের শিল্প এলাকায় যারা কাজ করেন, তাদের কাছে এই সংখ্যার মানে খুব সোজা। অর্ডার থাকলে কারখানা চলে, কারখানা চললে বেতন আসে, বেতন আসলে বাসা ভাড়া দেওয়া যায়, দোকানে কেনাকাটা হয়, আর কেউ কেউ ভবিষ্যতের জন্য জমাতে পারেন। রপ্তানির খবর তাই শুধু বন্দর বা জাহাজের খবর নয়। এটা শিল্প এলাকার চারপাশের বাসা, দোকান আর পরিবহনেরও খবর।

একটা সতর্ক কথাও প্রতিবেদনে আছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি মো. ফজলে শামীম এহসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, প্রতিবেদনে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা সব রপ্তানিকারকের বাস্তব অবস্থা পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। কথাটা মনে রাখা দরকার। বড় ছবি ভালো হলেও সব কারখানার অবস্থা এক রকম নয়। কারো অর্ডার বেশি, কারো কম। তাই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে সবার সমান সুখবর ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

প্রবাসীদের টাকা: অক্টোবরে ২৮৭ কোটি ডলার

Advertise on Estate News

দ্বিতীয় বড় সংখ্যাটা এসেছে প্রবাসীদের কাছ থেকে। অক্টোবরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮৭ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই মাসের চেয়ে ১২.১৮ শতাংশ বেশি। গত বছর অক্টোবরে এসেছিল ২৫৬ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে এসেছিল ২৭৭ কোটি ডলার, ফলে অক্টোবর আগের মাসের চেয়েও ভালো। ১ নভেম্বর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান।

অর্থবছরের হিসাবে ছবিটা আরও স্পষ্ট। জুলাই থেকে অক্টোবর, চার মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১০১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। বৃদ্ধি ১৩ শতাংশ। চার মাসে এই পরিমাণ টাকা আসা মানে দেশের বহু পরিবারের হাতে নিয়মিত আয় পৌঁছাচ্ছে।

এই টাকার একটা বড় অংশ যায় বাড়ি সংক্রান্ত কাজে। কেউ ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টের জন্য জমাচ্ছেন, কেউ ঋণের কিস্তি দিচ্ছেন, কেউ গ্রামের বাড়ি মেরামত করছেন, কেউ ঢাকায় ছোট ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করছেন। প্রবাসী পরিবারের কাছে রেমিট্যান্স তাই শুধু মাসের খরচ নয়, অনেক সময় জীবনের বড় সিদ্ধান্তের টাকা। টাকা যখন নিয়মিত আসে, তখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। যখন অনিয়মিত হয়, তখন পরিকল্পনা আটকে যায়।

পরিবারের হিসাবের জন্য এর মানে কী

এই দুটি সংখ্যা মিলিয়ে একটা ব্যবহারিক শিক্ষা আছে। রপ্তানি বাড়লে কাজের সুযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। রেমিট্যান্স বাড়লে পরিবারের হাতে নগদ টাকা থাকে। কিন্তু দুটোর কোনোটাই হাতে আসা টাকাকে নিজে থেকে সঞ্চয়ে বদলে দেয় না। সঞ্চয় হয় সিদ্ধান্তে। রেমিট্যান্সের টাকা আসার আগেই ঠিক করে রাখা ভালো, তার কতটা যাবে জরুরি খরচে, কতটা যাবে ঋণ শোধে, আর কতটা যাবে ফ্ল্যাট বা বাড়ির তহবিলে।

যারা ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এখনকার সময়টা একই সঙ্গে আশার আর সাবধানতার। আশার, কারণ বাইরে থেকে টাকা আসছে। সাবধানতার, কারণ ঋণের সুদ এখনো বেশি, আর দৈনন্দিন খরচের চাপ কমেনি। এই অবস্থায় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনটি জিনিস যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ: নিজের আয় কতটা নিয়মিত, ডাউন পেমেন্টের টাকা আলাদা করে রাখা আছে কি না, আর কিস্তি দেওয়ার পরও হাতে জরুরি খরচের টাকা থাকবে কি না। এই তিনটি উত্তর পরিষ্কার থাকলে রপ্তানি আর রেমিট্যান্সের ভালো খবরটা পরিবারের জন্য সত্যিকারের কাজে লাগে। আর একটা অভ্যাসও কাজে দেয়: মাসে একবার নিজের সঞ্চয়ের হিসাবটা কাগজে লিখে দেখা। লিখিত হিসাব থাকলে কোন খাতে টাকা যাচ্ছে, সেটা চোখে ধরা পড়ে, আর অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সহজ হয়।

অক্টোবরের তথ্য এখনো পুরো বছরের গল্প বলে না। সামনে অর্ডার, বিশ্ববাজার আর মুদ্রার গতিবিধির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তবে ১ নভেম্বরের তথ্য অন্তত এটুকু জানাচ্ছে, দেশের দুটি বড় আয়ের পথ এখনো খোলা আছে, আর সেই টাকা কারখানা থেকে পরিবারের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। আবাসনের বাজারের জন্য এর চেয়ে বাস্তব ভিত্তি আর কী হতে পারে।