মিরপুরের এক ক্রেতা কয়েক মাস আগে একটি ফ্ল্যাট পছন্দ করেছিলেন। দামে বনিবনা হলো, বুকিংয়ের টাকাও দেওয়া হলো। তারপর ব্যাংকের ফাইলে আটকে গেল কাজটা। একবার আয়ের কাগজে গরমিল, আরেকবার সম্পত্তির পুরোনো দলিলের একটি পাতা পাওয়া যাচ্ছিল না। ফ্ল্যাটটা হাতছাড়া হয়নি, কিন্তু সময় গেল অনেক। এই গল্পটা ঢাকায় নতুন নয়। হোম লোনের আবেদনে সবচেয়ে বেশি দেরি হয় কাগজের কারণেই, সুদের হার নিয়ে দরকষাকষির কারণে নয়।
ব্যাংক মূলত তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। আপনি কে, আপনি কত আয় করেন আর সেই আয় কতটা নিয়মিত, এবং যে সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তার মালিকানা কতটা পরিষ্কার। এই তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে যে কাগজগুলো লাগে, সেগুলো গুছিয়ে রাখলেই আবেদনের অর্ধেক কাজ শেষ।
পরিচয় আর করের কাগজ: সবার জন্য একই ভিত্তি
প্রথম ধাপে লাগে পরিচয়ের প্রমাণ। জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, সদ্য তোলা ছবি, আর ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের অনুলিপি চায় বেশিরভাগ ব্যাংক। সঙ্গে লাগে ই-টিআইএন সনদ আর সাম্প্রতিক কর রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র। যাঁরা যৌথভাবে ঋণ নিচ্ছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাগজ আলাদাভাবে দিতে হয়। নমিনির পরিচয়পত্র আর ছবিও চাওয়া হয়।
একটা ছোট ভুল এখানে বড় দেরি ডেকে আনে। পরিচয়পত্রে নামের বানান আর ব্যাংক হিসাবে নামের বানান না মিললে ব্যাংক ফাইল আটকে দেয়। আবেদনপত্রে স্বাক্ষরও পরিচয়পত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে মিলতে হয়। আবেদন করার আগে এই মিলগুলো নিজে একবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো। সিআইবি সংক্রান্ত ফরমেও স্বাক্ষর লাগে, যাতে ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে আবেদনকারীর আগের ঋণের ইতিহাস যাচাই করতে পারে।
আয়ের প্রমাণ: চাকরিজীবী আর ব্যবসায়ীর কাগজ আলাদা
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ব্যাংক দেখতে চায় বেতন সনদ, সাম্প্রতিক বেতনের স্লিপ, নিয়োগপত্র আর গত ১২ মাসের ব্যাংক বিবরণী। কোনো কোনো ব্যাংক জীবনবৃত্তান্তও চায়। বেতন নগদে পেলে প্রমাণ করা কঠিন হয়, তাই ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বেতন ঢোকার রেকর্ডটাই এখানে সবচেয়ে বড় ভরসা।
ব্যবসায়ীদের কাগজের তালিকা লম্বা। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসায়িক ব্যাংক বিবরণী, আয়কর রিটার্ন আর ক্ষেত্রবিশেষে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী চাওয়া হয়। ব্যাংক সূত্রগুলো সাধারণত তিন বছরের ট্রেড লাইসেন্সের কথা বলে, আর ব্যবসার স্থিতি বোঝার জন্য কয়েক বছরের লেনদেন দেখে। ডাক্তার, স্থপতির মতো পেশাজীবীদের পেশাগত সনদ আর সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্যপদের প্রমাণ দিতে হয়। যাঁর ভাড়া থেকে আয় আছে, তাঁর ভাড়ার চুক্তিপত্র আর মালিকানার কাগজও আয়ের প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে হয়।
এখানে মনে রাখার বিষয় হলো, ব্যাংক ঘোষিত আয় নয়, প্রমাণিত আয় দেখে। মুখে বলা আয় আর ব্যাংক বিবরণীতে দেখা আয়ের মধ্যে ফারাক থাকলে ঋণের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তাই আবেদনের কয়েক মাস আগে থেকেই আয়ের লেনদেন ব্যাংক হিসাবের মধ্য দিয়ে চালানো বুদ্ধিমানের কাজ।
সম্পত্তির কাগজ: যেখানে সবচেয়ে বেশি সময় যায়
ঋণের সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ অংশ সম্পত্তির কাগজ যাচাই। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে লাগে মালিকানার দলিল, বিক্রয় চুক্তি বা বায়না দলিল, ডেভেলপারের কাগজপত্র, রাজউক অনুমোদিত নকশা আর অনুমোদনপত্র। জমি থাকলে খতিয়ান, মিউটেশন আর হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ চাওয়া হয়। নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথাও আসে।
ব্যাংক নিজস্ব মূল্যায়নকারী পাঠিয়ে সম্পত্তির মূল্য যাচাই করে, আর আইনজীবীর মাধ্যমে দলিলের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করে। পুরোনো দলিলে কোনো ফাঁক থাকলে, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের অমিল থাকলে, বা মিউটেশন হালনাগাদ না থাকলে এই ধাপে আটকে যায়। ক্রেতার করণীয় হলো, বুকিং দেওয়ার আগেই বিক্রেতার কাছ থেকে এই কাগজগুলোর অনুলিপি চেয়ে নিজে একজন আইনজীবীকে দিয়ে দেখিয়ে নেওয়া। ঋণের আবেদন আর সম্পত্তি যাচাই একসঙ্গে এগোলে সময় বাঁচে।
যে ভুলগুলো বারবার অনুমোদন পিছিয়ে দেয়
প্রথম ভুল হলো আধা কাগজ নিয়ে আবেদন করা। ব্যাংক ফাইল জমা নিলেও অসম্পূর্ণ ফাইল এগোয় না। দ্বিতীয় ভুল, অন্য ঋণের কিস্তি গোপন করা। সিআইবি প্রতিবেদনে তা ধরা পড়বেই, আর তখন ব্যাংকের আস্থা কমে যায়। তৃতীয় ভুল, সম্পত্তির কাগজের ত্রুটি নিয়ে শেষ মুহূর্তে জানা। চতুর্থ ভুল, একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকে আবেদন করে প্রতিটিতে আলাদা তথ্য দেওয়া।
একটা বাস্তবসম্মত সময়সীমা মাথায় রাখুন। কাগজ ঠিক থাকলে অনুমোদন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে, কিন্তু কোনো একটি ধাপে গোলমাল দেখা দিলে মাস পেরিয়ে যেতে পারে। তাই ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তিতে কিস্তি দেওয়ার সময়সূচি এমনভাবে রাখুন, যাতে ঋণ অনুমোদনে কিছুটা দেরি হলেও চাপ তৈরি না হয়।
যৌথ আবেদনের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মনে রাখুন। স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের দুজন মিলে ঋণ নিলে দুজনের আয়ের কাগজই জমা দিতে হয়, আর দুজনের ক্রেডিট ইতিহাসই যাচাই হয়। গ্যারান্টর থাকলে তাঁর পরিচয়পত্র, ছবি আর আয়ের প্রমাণও ফাইলে যুক্ত হয়। সব কাগজের একটি করে অনুলিপি নিজের কাছে রাখুন, যাতে ব্যাংক কোনো কাগজ আবার চাইলে দ্রুত দেওয়া যায়।
শেষ কথা সহজ। কাগজ গোছানো কোনো আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা নয়, এটি আপনার নিজের সুরক্ষা। যে কাগজ ব্যাংককে আশ্বস্ত করে, সেই কাগজই প্রমাণ করে ফ্ল্যাটটির মালিকানা পরিষ্কার আর আপনার আয় যথেষ্ট। আবেদনের আগে এই তালিকা ধরে একবার ফাইলটা সাজিয়ে নিন, তারপর ব্যাংকের দরজায় যান।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য মাত্র, আর্থিক পরামর্শ নয়। ঋণের শর্ত ব্যাংকভেদে আলাদা হয়, তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লিখিত শর্ত পড়ে নিন।




