দুবাইয়ের নাম শুনলে অনেক বাংলাদেশি ক্রেতার মনে প্রথমে ভেসে ওঠে উঁচু টাওয়ার, মেরিনার পানি আর নতুন ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন। কেউ সেখানে থাকার পরিকল্পনা করেন, কেউ পরিবারের কাউকে রাখতে চান, কেউ ভাড়া থেকে আয়ের কথা ভাবেন। আগ্রহটা বাস্তব। কিন্তু দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনা মানে শুধু বিজ্ঞাপনের দামটা দেওয়া নয়। দামের সঙ্গে ফি, সার্ভিস চার্জ, ভিসার নিয়ম আর বিক্রির সময়ের হিসাবও জড়িয়ে আছে। এগুলো আগেভাগে না জানলে পরে অঙ্কটা বদলে যেতে পারে।
এই লেখাটা তথ্য দেওয়ার জন্য, পরামর্শ দেওয়ার জন্য নয়। দুবাইয়ে সম্পত্তি কেনা আর্থিক সিদ্ধান্ত, আর তাতে লাভের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখানে যে সংখ্যাগুলো আছে, সেগুলো প্রকাশিত নির্দেশনা আর প্রতিবেদন থেকে নেওয়া। কোনো নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট কেনার আগে দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের নিয়ম, ব্যাংকের শর্ত আর একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবীর পরামর্শ যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ পথ।
কোথায় কেনা যায়, আর কোথায় যায় না
প্রথম নিয়মটা এলাকা নিয়ে। বিদেশিরা দুবাইয়ের সব জায়গায় পূর্ণ মালিকানা পান না। পূর্ণ মালিকানা, যাকে ফ্রিহোল্ড বলা হয়, শুধু নির্ধারিত ফ্রিহোল্ড এলাকায় মেলে। এর মধ্যে আছে দুবাই মেরিনা, ডাউনটাউন দুবাই, বিজনেস বে, পাম জুমেইরা, জুমেইরা ভিলেজ সার্কেল, দুবাই হিলস এস্টেট, জুমেইরা লেক টাওয়ার্স আর ডুবাই সাউথের মতো পরিচিত এলাকা। এসব এলাকার বাইরে সাধারণত লিজহোল্ড বা সীমিত অধিকার মেলে। তাই ফ্ল্যাট পছন্দ করার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই ঠিকানাটা ফ্রিহোল্ড এলাকার ভেতরে পড়ে কি না, আর দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের রেকর্ডে মালিকানার ধরন কী লেখা আছে।
বিদেশি ক্রেতার জন্য পাসপোর্টই পরিচয়ের মূল নথি। দুবাইয়ে থাকার ভিসা না থাকলেও নির্ধারিত এলাকায় কেনা যায় বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
দামের ওপর যে খরচগুলো যোগ হয়
দুবাইয়ে কেনার হিসাবটা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা সহজ। ধরা যাক, একটা রিসেল ফ্ল্যাটের দাম ২০ লাখ দিরহাম। এর ওপর দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের ট্রান্সফার ফি ৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৮০ হাজার দিরহাম। রিসেল কেনায় এজেন্ট কমিশন সাধারণত ২ শতাংশ, তার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট। ট্রাস্টি আর রেজিস্ট্রেশন ফি মিলিয়ে আরও কয়েক হাজার দিরহাম যোগ হয়। সব মিলিয়ে নগদে কেনার ক্ষেত্রে দামের ওপর প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তি খরচ ধরে রাখতে বলা হয়েছে ২০২৬ সালের প্রকাশিত নির্দেশনায়। ঋণ নিয়ে কিনলে ব্যাংকের খরচ যোগ হয়ে তা ৮ থেকে ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ব্যাংক এখন আর ট্রান্সফার ফি, এজেন্ট কমিশন আর সংশ্লিষ্ট খরচ ঋণের ভেতরে ঢোকাতে পারে না। অর্থাৎ ডাউন পেমেন্টের মতো এই ফিগুলোও নিজের টাকা থেকে দিতে হয়। ২০ লাখ দিরহামের ফ্ল্যাটে এই নিয়ম মানে কেনার সময় হাতে রাখার মতো নগদ টাকার পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়ে যায়। ঋণের ক্ষেত্রে মর্টগেজ রেজিস্ট্রেশন ফি ঋণের ০.২৫ শতাংশ, সঙ্গে ছোট প্রশাসনিক ফি। ব্যাংকের অ্যারেঞ্জমেন্ট ফি সাধারণত ঋণের ০.৫ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে থাকে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ আছে।
নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট, যাকে অফ-প্ল্যান বলা হয়, তার হিসাব কিছুটা আলাদা। সেখানে প্রায়ই ১০ থেকে ২০ শতাংশ দিয়ে শুরু করা যায়, তারপর নির্মাণের ধাপে ধাপে কিস্তি দিতে হয়। রেজিস্টার্ড অফ-প্ল্যান প্রকল্পের টাকা রিয়েল এস্টেট রেগুলেটরি এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে এসক্রো হিসাবে যায়, যা ক্রেতাকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অফ-প্ল্যান মানেই সস্তা নয়। হস্তান্তরে দেরি হলে, প্রকল্পের মান প্রত্যাশার চেয়ে আলাদা হলে, বা এলাকায় একসঙ্গে অনেক ফ্ল্যাট তৈরি হলে, ভাড়া বা বিক্রির হিসাব বদলে যেতে পারে।
ভাড়া, সার্ভিস চার্জ আর গোল্ডেন ভিসা
ভাড়ার আয়ের প্রসঙ্গে যে সংখ্যাটা প্রায়ই উল্লেখ হয়, সেটা গ্রস ইয়েল্ড। এঙ্গেল অ্যান্ড ভোকার্সের বরাতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের গড় গ্রস রেন্টাল ইয়েল্ড প্রায় ৬.৬ শতাংশ বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রস মানে মোট ভাড়া, সেখান থেকে খরচ বাদ দেওয়ার আগের হিসাব। আসল আয় বুঝতে সার্ভিস চার্জ বাদ দিতে হয়। ভবন আর এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে বছরে সার্ভিস চার্জ অনেকটা আলাদা হয়। কোথাও ১০ থেকে ১৫ দিরহাম, কোথাও ২০ থেকে ৩৫ দিরহাম পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়। বড় ফ্ল্যাটে এই চার্জ বছরে বড় অঙ্কে পৌঁছায়। ভাড়া থেকে খালি থাকার সময়, রক্ষণাবেক্ষণ আর ব্যবস্থাপনার খরচ বাদ দিলে নেট আয় গ্রসের চেয়ে কম হয়। এটা না বুঝে শুধু গ্রস সংখ্যা দেখে কেনা ভুল হতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দুবাইয়ে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০টি আবাসিক বিক্রি হয়েছে, মোট মূল্য প্রায় ২২৬ বিলিয়ন দিরহাম বলে একই প্রতিবেদনের বরাতে জানানো হয়েছে। এর ৭০ শতাংশের বেশি ছিল অফ-প্ল্যান। অর্থাৎ বাজার ব্যস্ত আছে, কিন্তু তার বড় অংশ এখনো তৈরি হয়নি এমন ফ্ল্যাটের কেনাবেচা। ব্যস্ত বাজার মানেই দাম শুধু বাড়বে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ২০২৬ আর ২০২৭ সালে অনেক নতুন ফ্ল্যাট আসার কথা আছে, আর কিছু এলাকায় ভাড়া নরম হওয়ার কথা বিশ্লেষকরা বলছেন বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় উল্লেখ আছে। দুবাইয়ের বাজার আগেও বড় সংশোধন দেখেছে, ২০০৮ সালের পর আর ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি। ইতিহাস ভবিষ্যৎ বলে না, কিন্তু ঝুঁকি যে আছে, সেটা মনে করিয়ে দেয়।
গোল্ডেন ভিসার নিয়মটা অনেকের আগ্রহের জায়গা। কমপক্ষে ২০ লাখ দিরহাম মূল্যের সম্পত্তি ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসার জন্য যোগ্য হতে পারে বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধকি বা নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রেও এই ভিসা মিলতে পারে বলে উল্লেখ আছে। তবে ভিসার শর্ত, নথি আর আবেদন প্রক্রিয়া সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কেনার সিদ্ধান্ত শুধু ভিসার ওপর দাঁড় করানোর আগে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বর্তমান নিয়ম যাচাই করে নেওয়া দরকার।
ঢাকায় কেনার সঙ্গে তুলনা
ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার সঙ্গে দুবাইয়ের তুলনা করলে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়। ঢাকায় ক্রেতা নিজের শহর, আইন আর বাজার চেনেন। পরিবারের কাছাকাছি থাকা যায়, ফ্ল্যাট নিজে ব্যবহার করা যায়, আর সমস্যা হলে নিজে গিয়ে দেখা যায়। দুবাইয়ে সুবিধা অন্য জায়গায়: ফ্রিহোল্ড মালিকানা, ব্যক্তিগত আয়ের ওপর কর না থাকা আর বার্ষিক সম্পত্তি কর না থাকার মতো বৈশিষ্ট্য অনেক ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। তবে দূর থেকে সম্পত্তি দেখাশোনা করা, ভাড়াটিয়া খোঁজা, সার্ভিস চার্জ দেওয়া আর আইনি কাজ সামলানো, এসবের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাপনা লাগে।
বাংলাদেশি ক্রেতার জন্য আরেকটা ধাপ আছে, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিদেশে সম্পত্তি কেনার জন্য টাকা পাঠানোর নিয়ম, কর সংক্রান্ত দায় আর নথির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বর্তমান নিয়ম আগেই জেনে নিতে হবে। এই লেখায় সেই নিয়মের বিস্তারিত দেওয়া হয়নি, কারণ তা ব্যক্তির অবস্থা আর সময়ের ওপর নির্ভর করে বদলাতে পারে। টাকা পাঠানোর পথ পরিষ্কার না করে বুকিং দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
শেষে, কেনার আগে নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করা ভালো। ফ্ল্যাটটা নিজে ব্যবহার করবেন, না ভাড়া দেবেন। ভাড়া দিলে খালি থাকার কয়েক মাসের খরচ সামলাতে পারবেন কি না। সার্ভিস চার্জসহ বছরের মোট খরচ কত দাঁড়ায়। হস্তান্তরে দেরি হলে পরিকল্পনা কী হবে। আর দাম কমলে কয়েক বছর ধরে রাখার মতো ধৈর্য আর টাকা আছে কি না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার থাকলে দুবাইয়ের ফ্ল্যাটটা স্বপ্নের বিজ্ঞাপন থেকে বাস্তব হিসাবের জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আর সেখানেই ভালো সিদ্ধান্তের শুরু।




