ঢাকার অনেক ফ্ল্যাটে বাথরুমটাই সবচেয়ে ছোট ঘর। সকালে সেখানে তাড়াহুড়ো, রাতে সেখানে ক্লান্তি। আর সংস্কারের সময় দেখা যায়, টাইলসের রং বাছতে যত সময় যায়, পানি কোন দিকে গড়াবে, দরজা খুললে ভেতরে জায়গা থাকবে কি না, এই প্রশ্নগুলোতে তত সময় যায় না। অথচ ছোট বাথরুমে এই প্রশ্নগুলোই আসল। রং পরে বদলানো যায়। ভুল লেআউট বদলাতে আবার ভাঙতে হয়।
প্রথম কাজটা তাই চোখ দিয়ে নয়, পা দিয়ে মাপা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকুন। শাওয়ার নেওয়ার জায়গায় দাঁড়ান। বেসিনের সামনে হাত ধোয়ার ভঙ্গি করুন। কমোডে বসার পর দুই পাশে হাঁটু রাখার জায়গা আছে কি না, দেখুন। এই চারটি জায়গার কোনো একটিতে যদি শরীর আটকে যায়, তাহলে বুঝতে হবে লেআউটেই সমস্যা। অনেক পুরোনো ফ্ল্যাটে বাথরুমের দরজা এমনভাবে বসানো থাকে যে দরজা খুললেই বেসিনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। স্লাইডিং দরজা বা বাইরের দিকে খোলা দরজা অনেক সময় এই সমস্যার সহজ সমাধান হয়। তবে দরজা বদলানোর আগে দেখে নিতে হবে করিডোরে জায়গা আছে কি না, আর দরজার ফ্রেমের কাজে দেয়ালের পাইপে হাত পড়বে কি না।
ভেজা আর শুকনো অংশ আলাদা করুন
ছোট বাথরুমের সবচেয়ে বড় শত্রু সারাক্ষণ ভেজা মেঝে। শাওয়ার থেকে পানি ছড়িয়ে পুরো মেঝে ভিজে গেলে বাথরুমটা আর ব্যবহারের আরাম থাকে না, পিছলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই সংস্কারের শুরুতেই ঠিক করুন, কোন অংশ ভিজবে আর কোন অংশ শুকনো থাকবে। শাওয়ারের জায়গায় মেঝে সামান্য ঢালু করে ড্রেনের দিকে নামিয়ে দেওয়া, আর কাচের পার্টিশন বা ভালো মানের শাওয়ার কার্টেন ব্যবহার করা, এই দুটি সিদ্ধান্তই অনেকটা কাজ করে দেয়।
ড্রেনের অবস্থান এখানে বড় ভূমিকা রাখে। পুরোনো ফ্ল্যাটে ড্রেন সরানো মানে মেঝে কেটে পাইপের লাইন বদলানো, যা খরচ আর সময় দুটোই বাড়ায়। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ড্রেনের জায়গা রেখে তার চারপাশে লেআউট সাজানোই বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন ড্রেন বসাতে হলে মিস্ত্রির সঙ্গে আগেই কথা বলে নিন, পানি ঠিকমতো নামছে কি না, সেটা টাইলস বসানোর আগে পরীক্ষা করে নেওয়া যায় কি না। টাইলস বসে যাওয়ার পর এই পরীক্ষা আর সহজ থাকে না।
ওয়াটারপ্রুফিংয়ে কাটছাঁট নয়
বাথরুমের সংস্কারে একটা জায়গায় কখনো সাশ্রয় করা উচিত নয়, আর সেটা হলো ওয়াটারপ্রুফিং। দেয়াল আর মেঝের সংযোগস্থল, পাইপের চারপাশ, শাওয়ারের দেয়াল, এই জায়গাগুলো দিয়ে পানি চুইয়ে নিচের তলায় বা পাশের ঘরের দেয়ালে দাগ ফেলতে পারে। সমস্যাটা তখনই ধরা পড়ে, যখন রং নষ্ট হয়ে গেছে বা প্লাস্টার ফুলে উঠেছে। তখন মেরামতের খরচ সংস্কারের চেয়ে কম হয় না।
কাজ শুরুর আগে মিস্ত্রি বা ঠিকাদারের কাছে পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করুন, কোন স্তরে কী ব্যবহার করা হবে, আর প্রতিটি স্তর শুকাতে কত সময় দেওয়া হবে। তাড়াহুড়ো করে পরের স্তর বসালে ওয়াটারপ্রুফিং দুর্বল হয়। পুরোনো টাইলস তুলে ফেলার পর মেঝে আর দেয়ালের অবস্থা দেখে নেওয়াও জরুরি। কোথাও ফাটল থাকলে সেটা ঢেকে টাইলস বসিয়ে দিলে ফাটলটা চলে যায় না, শুধু চোখের আড়াল হয়।
দেয়ালে জায়গা খুঁজুন, মেঝেতে নয়
ছোট বাথরুমে মেঝেতে কিছু রাখার জায়গা প্রায় থাকে না। তাই স্টোরেজের হিসাবটা দেয়াল থেকে শুরু করতে হয়। বেসিনের ওপরের আয়নার ক্যাবিনেটে দৈনন্দিন জিনিস রাখা যায়। দরজার ওপরের ফাঁকা দেয়ালে একটা তাক বসালে বাড়তি তোয়ালে বা পরিষ্কারের জিনিস রাখা যায়। শাওয়ারের দেয়ালে ছোট কুলুঙ্গি বা নিচ কাটা থাকলে শ্যাম্পু আর সাবান মেঝেতে রাখতে হয় না।
তবে সব দেয়ালে তাক বসানো যায় না। যেসব দেয়ালের ভেতর দিয়ে পানির পাইপ গেছে, সেখানে ড্রিল করার আগে পাইপের অবস্থান জেনে নেওয়া দরকার। ফ্ল্যাটের পুরোনো নকশা না থাকলে অভিজ্ঞ মিস্ত্রি অনেক সময় দেয়ালের শব্দ আর পাইপের লাইন দেখে আন্দাজ করতে পারেন, কিন্তু আন্দাজের ওপর ভরসা করে ড্রিল করা ঠিক নয়। হালকা জিনিসের জন্য আঠালো হুক বা সাকশন র্যাক ব্যবহার করা যায়, ভারী তাকের জন্য দেয়ালের ধরন বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়।
আরেকটা কথা। বাথরুমে অনেক জিনিস রাখার অভ্যাস থাকলে সংস্কারের আগে একবার বাছাই করে নিন। যেটা গত ছয় মাসে ব্যবহার হয়নি, সেটা বাথরুমে রাখার দরকার আছে কি না, ভেবে দেখুন। স্টোরেজ বাড়ানোর চেয়ে জিনিস কমানো অনেক সময় বেশি কাজে দেয়।
বাজেট: আগে অদৃশ্য কাজ, পরে দৃশ্যমান সাজ
সংস্কারের বাজেটে সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা হলো সুন্দর জিনিসে টাকা খরচ করে অদৃশ্য কাজে কম টাকা রাখা। দামি টাইলস আর ফিটিংস চোখে পড়ে। পাইপ, ড্রেন আর ওয়াটারপ্রুফিং চোখে পড়ে না। কিন্তু বাথরুমের আয়ু ঠিক করে দ্বিতীয় দলটাই। তাই বাজেট ভাগ করার সময় প্রথমে প্লাম্বিং, ওয়াটারপ্রুফিং আর মেঝের ঢালের জন্য টাকা আলাদা করে রাখুন। তারপর টাইলস, বেসিন আর ফিটিংসের দিকে যান।
দামি আর মাঝারি দামের টাইলসের পার্থক্য অনেক সময় চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু পিছলে যাওয়া ঠেকানোর গুণে ধরা পড়ে। বাথরুমের মেঝের টাইলস বাছার সময় দেখতে সুন্দর কি না, তার চেয়ে ভেজা অবস্থায় পা আটকে থাকে কি না, সেটা বেশি জরুরি। দেয়ালের টাইলসে হালকা রং ব্যবহার করলে ছোট জায়গা বড় মনে হয়, আর আলো কম থাকলেও ঘরটা অন্ধকার লাগে না। বড় টাইলসে জোড়া কম থাকে, পরিষ্কার করাও সহজ হয়। তবে বড় টাইলস কাটতে আর বসাতে দক্ষ হাত লাগে।
আলো আর বাতাসের কথা আলাদা করে ভাবুন। ছোট বাথরুমে একটা উজ্জ্বল সাদা আলো থাকলে আয়নার সামনে কাজ সহজ হয়। আর এক্সহস্ট ফ্যান ঠিকমতো চললে আর্দ্রতা কমে, দেয়ালে ছত্রাক পড়ার ঝুঁকি কমে। জানালা থাকলে জানালার কাছে কিছু রাখবেন না, যাতে বাতাস চলাচল আটকে না যায়। জানালা না থাকলে ফ্যানের দিকে নজর দেওয়াই একমাত্র উপায়।
কাজ চলাকালীন তিনটি পরীক্ষা
সংস্কার চলার সময় তিনটি সময়ে নিজে উপস্থিত থাকা ভালো। এক, পুরোনো টাইলস তোলার পর, যখন মেঝে আর পাইপের আসল অবস্থা দেখা যায়। দুই, ওয়াটারপ্রুফিং শেষ হওয়ার পর, টাইলস বসানোর আগে। তিন, সব ফিটিংস লাগানোর পর, যখন পানি ছেড়ে ড্রেন, কল আর শাওয়ার পরীক্ষা করা যায়। এই তিনটি সময়ে ধরা পড়া ভুল পরে সারানো কঠিন হয়ে যায়। প্রতিটি ধাপের ছবি তুলে রাখলে পরে কোনো সমস্যা হলে বোঝা সহজ হয়, কোথায় কী করা হয়েছিল।
শেষ কথা একটাই। ছোট বাথরুমের সংস্কার মানে জায়গা বাড়ানো নয়। মানে একই জায়গাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে সকালে তাড়াহুড়োর মধ্যেও পা পিছলে না যায়, জিনিস খুঁজতে সময় নষ্ট না হয়, আর পানি যেখানে যাওয়ার কথা, সেখানেই যায়। এই হিসাবটা ঠিক থাকলে বাথরুম ছোট হলেও রোজকার ব্যবহারটা বড় স্বস্তির হয়।


