একটা বাড়ি বানানোর হিসাব শুরু হয় সাধারণত বড় খরচগুলো দিয়ে। জমি, নকশা, রড, সিমেন্ট: এই তালিকাটা সবার মুখস্থ। ইট, বালু আর পাথর সেই তালিকায় থাকে, কিন্তু তাদের গুরুত্ব অনেক সময় কম করে দেখা হয়। অথচ একটা দোতলা বাড়ির গাঁথুনি, প্লাস্টার আর ঢালাইয়ে এই তিনটি উপকরণের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। এগুলোর মান খারাপ হলে দেয়ালে ফাটল ধরে, প্লাস্টার খসে পড়ে, আর মেরামতের খরচ পরে বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইটের ক্ষেত্রে প্রথম পরীক্ষা চোখে আর হাতে। ভালো ইটের রং সমান, ধার শক্ত, আর দুটো ইট ঠুকলে ধাতব শব্দ হয়। ভাঙা ইট, বাঁকা ইট আর কম পোড়া ইট গাঁথুনিতে দুর্বলতা আনে। মিস্ত্রিরা প্রায়ই বলেন, এক লরি ইটের মধ্যে কিছু ইট ভাঙা থাকবেই, এটা স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, ভাঙার পরিমাণ কতটা। যে বাড়িওয়ালা ডেলিভারির সময় ইট গুনে নেন আর ভাঙা ইট আলাদা করে রাখেন, তিনি পরে হিসাব মেলাতে পারেন। যিনি গুনে নেন না, তিনি শেষে বুঝতে পারেন, ইট কম পড়েছে, অথচ টাকা পুরোটাই গেছে।
বালু আর পাথরের মান চেনা
বালুর মান বোঝা ইটের চেয়ে কঠিন, কারণ বালু দেখতে প্রায় একরকম। তবু পার্থক্য আছে। নদীর বালু আর মাঠের বালুর মধ্যে কাদা আর লবণের পরিমাণ আলাদা হয়। কাদা বেশি থাকলে মসলা দুর্বল হয়, আর লবণ থাকলে দেয়ালে সাদা দাগ ওঠে। অভিজ্ঞ মিস্ত্রি এক মুঠো বালু হাতে নিয়ে, পানিতে ধুয়ে, তার গুণ সম্পর্কে ধারণা পান। বাড়িওয়ালার জন্য সহজ উপায় হলো, পরিচিত সরবরাহকারীর কাছ থেকে নেওয়া আর প্রয়োজনে মিস্ত্রির পরামর্শে নমুনা পরীক্ষা করানো।
পাথর বা খোয়ার ক্ষেত্রে আকার আর শক্তি দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ঢালাইয়ের জন্য পাথরের টুকরো হতে হয় নির্দিষ্ট মাপের, আর তাতে ধুলো-মাটি কম থাকতে হয়। ভাঙা ইটের খোয়া আর পাথরের খোয়ার ব্যবহার আলাদা, আর কোন কাজে কোনটা উপযুক্ত, সেটা প্রকৌশলীর পরামর্শে ঠিক হওয়া উচিত। সস্তার খোয়া কিনে প্রথমে কিছু টাকা বাঁচলেও, ঢালাই দুর্বল হলে তার মূল্য দিতে হয় অনেক বছর ধরে।
পরিবহন, অপচয় আর সংরক্ষণ
ইট, বালু আর পাথরের দামের একটা বড় অংশ আসলে পরিবহন। ঢাকার ভেতরে একটা প্লটে মাল পৌঁছানো আর গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের একটা প্লটে পৌঁছানো এক খরচ নয়। সরু গলি হলে বড় ট্রাক ঢুকতে পারে না, তখন ছোট গাড়িতে বারবার মাল আনতে হয়, আর প্রতিবার খরচ বাড়ে। বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তা আর জলাবদ্ধতা এই খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। বাজেট করার সময় শুধু মালের দাম নয়, পৌঁছানোর খরচটাও ধরা উচিত।
অপচয় আরেকটি লুকানো খরচ। বালু খোলা জায়গায় রাখলে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়, আর শুকনো মৌসুমে বাতাসে উড়ে যায়। ইট স্তূপ করে রাখলে নিচের স্তর ভেঙে যায়। পাথর মাটির ওপর রাখলে মাটি মিশে যায়। যিনি মাল ঢেকে রাখেন, উঁচু জায়গায় স্তূপ করেন আর কাজের হিসাব রাখেন, তিনি একই পরিমাণ মাল দিয়ে বেশি কাজ করাতে পারেন। এটা কোনো বড় কৌশল নয়, এটা শুধু যত্ন।
বাজেটে এই খরচগুলো ধরা
বাড়ি বানানোর বাজেটে ইট, বালু আর পাথরের জন্য আলাদা একটা অংশ রাখা ভালো, যেখানে পরিবহন আর কিছুটা অপচয়ের খরচও ধরা থাকে। সরবরাহকারীর সঙ্গে লিখিতভাবে পরিমাণ, মান আর ডেলিভারির সময় ঠিক করে নেওয়া উচিত। মুখের কথায় মাল এলে পরে অভিযোগের জায়গা থাকে না। আর কাজ শুরুর আগে মিস্ত্রি আর প্রকৌশলীর সঙ্গে বসে মোট পরিমাণের একটা হিসাব মিলিয়ে নেওয়া উচিত, যাতে মাঝপথে মাল ফুরিয়ে কাজ থেমে না যায়।
এই উপকরণগুলো চোখে পড়ে না বলেই এগুলো নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। একটা বাড়ির দেয়াল, মেঝে আর ছাদ দাঁড়িয়ে থাকে ইট, বালু আর পাথরের ওপর। সেগুলোর মান আর হিসাব ঠিক থাকলে বাড়িটা যেমন মজবুত হয়, তেমনি বাজেটও শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থাকে।


