একটি ভবন তৈরির আগে এখন আর শুধু কাগজের নকশা আঁকলেই চলে না। অনেক প্রকল্পে ভবনের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মডেল তৈরি করা হয় — যেখানে দেয়াল, পাইপ, বৈদ্যুতিক লাইন, লিফটের জায়গা সবকিছু একসঙ্গে দেখা যায়। এর নাম বিআইএম, অর্থাৎ বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোন জরিপ, লেজার মাপ আর নির্মাণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ডিজিটাল পদ্ধতি।
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি এখনো সব প্রকল্পে ব্যবহৃত হয় না। বড় প্রকল্পে এর ব্যবহার বাড়ছে, ছোট প্রকল্পে এখনো কাগজ আর অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরতাই বেশি। তবু প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: এই প্রযুক্তি আসলে কী বদলাতে পারে, আর কী বদলাতে পারে না?
বিআইএম আসলে কী
সহজ করে বললে, বিআইএম হলো ভবনের একটি জীবন্ত নকশা। সাধারণ নকশায় শুধু রেখা আর মাপ থাকে। বিআইএম মডেলে প্রতিটি অংশের তথ্য থাকে — কোন দেয়ালে কী উপাদান, পাইপ কোথা দিয়ে যাবে, লোড কতটা, রক্ষণাবেক্ষণে কী লাগবে।
এর ফলে একটি বড় সুবিধা হয়। স্থপতি, প্রকৌশলী আর ঠিকাদার একই মডেল দেখে কাজ করেন। ফলে নকশায় ভুল থাকলে তা নির্মাণ শুরুর আগেই ধরা পড়ে। যেমন, পাইপ আর বৈদ্যুতিক লাইনের সংঘাত, বা লিফটের জায়গায় পর্যাপ্ত উচ্চতা না থাকা — এসব সমস্যা কাগজে ধরা কঠিন, কিন্তু ত্রিমাত্রিক মডেলে সহজে চোখে পড়ে।
এতে খরচের হিসাবও পরিষ্কার হয়। মডেল থেকে জানা যায় কতটা রড, সিমেন্ট, ইট বা টাইলস লাগবে। ফলে উপকরণের অপচয় কমে, আর কাজের মাঝপথে হঠাৎ খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমে। তবে এখানেই সতর্কতা দরকার: মডেল যত ভালোই হোক, বাস্তবে মাপ, মাটির অবস্থা আর সরবরাহের দেরি হিসাব বদলে দিতে পারে।
ড্রোন কী কাজে লাগে
ড্রোন এখন নির্মাণের চোখ হয়ে উঠেছে। জমি জরিপ, নির্মাণের অগ্রগতি দেখা, ছাদের অবস্থা পরীক্ষা আর বড় এলাকার ছবি তোলা — এসব কাজে ড্রোন দ্রুত ও কম খরচে তথ্য দিতে পারে।
ঢাকার মতো ঘন শহরে এর আরেকটি ব্যবহার আছে। নির্মাণের বিভিন্ন ধাপের ছবি সংরক্ষণ করা গেলে পরে বোঝা যায় কাজ ঠিকমতো হয়েছে কি না। ক্রেতার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রকল্পের অগ্রগতির নিয়মিত ছবি থাকলে শুধু বিজ্ঞাপনের কথায় ভরসা করতে হয় না।
তবে ড্রোন মানেই নির্ভুল তথ্য নয়। আবহাওয়া, অনুমতি আর চালকের দক্ষতা এর ওপর প্রভাব ফেলে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন ওড়ানোর নিয়ম মানতে হয়, আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়।
প্রযুক্তি নির্মাণকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে, কিন্তু ভালো প্রকৌশল, সৎ তদারকি আর সঠিক উপকরণের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যন্ত্র নয়, দক্ষতা আর খরচ। বিআইএম চালাতে প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। ছোট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ আর নিয়মিত হালনাগাদের খরচ বহন করা কঠিন হতে পারে। ফলে বড় ও ছোট প্রকল্পের মধ্যে ব্যবধান বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
আরেকটি বিষয় হলো তথ্যের মান। নকশা যদি ভুল তথ্য দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে ডিজিটাল মডেলও ভুল ফল দেবে। মাটি পরীক্ষা, অনুমোদিত নকশা আর বাস্তব মাপ ঠিক না থাকলে প্রযুক্তি সেই ভুল ঢাকতে পারবে না, বরং আরও পরিষ্কার করে তুলে ধরবে।
তবু সম্ভাবনা স্পষ্ট। সরকারি ও বড় বেসরকারি প্রকল্পে ডিজিটাল নকশা বাধ্যতামূলক হলে মানের একটি সাধারণ মান তৈরি হতে পারে। নির্মাণের অগ্রগতি ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হলে হস্তান্তরের পর রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হবে। ভবনের পাইপ, তার আর কাঠামোর তথ্য থাকলে মেরামতের সময় দেয়াল ভাঙার প্রয়োজন কমবে।
ক্রেতা ও ছোট নির্মাতার জন্য পরামর্শ
- প্রকল্পের নকশা অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করুন। ডিজিটাল মডেল থাকলেও অনুমোদন ছাড়া তার মূল্য সীমিত।
- নির্মাণের অগ্রগতির ছবি বা প্রতিবেদন চান। নিয়মিত তথ্য দেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বেশি রাখা যায়।
- প্রযুক্তির নাম শুনেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। জানতে চান, এই প্রযুক্তি দিয়ে আসলে কী যাচাই করা হচ্ছে — খরচ, মান, নাকি শুধু প্রচার।
- ছোট নির্মাতাদের জন্য শুরুটা হতে পারে সহজভাবে: ডিজিটাল মাপ, ছবি সংরক্ষণ আর একটি সাধারণ ত্রিমাত্রিক নকশা দিয়ে। একবারে সবকিছু বদলানোর দরকার নেই।
বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে প্রযুক্তির আসল পরীক্ষা হবে মাঠে। ড্রোন আর বিআইএম যদি খরচ কমায়, ভুল কমায় আর ক্রেতার কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়, তাহলে এর ব্যবহার বাড়বে। আর যদি তা শুধু বিজ্ঞাপনের ভাষা হয়ে থাকে, তাহলে বাজার নিজেই তা বাতিল করবে। প্রযুক্তি সহায়ক, সিদ্ধান্তের ভার এখনো মানুষের হাতেই।
প্রতিদিনের সম্পত্তি, বাজার ও অর্থের খবর পেতে ফেসবুকে Estate News ফলো করুন: https://www.facebook.com/profile.php?id=61593817347872


