চাবি হাতে পাওয়ার দিনটা উত্তেজনার, আবার কিছুটা ফাঁকা ফাঁকাও লাগে। ঘরে আলো আছে, মেঝে পরিষ্কার, কিন্তু বসার জায়গা নেই, রান্নাঘরে হাঁড়ি রাখার জায়গা নেই, রাতে ঘুমানোর জন্য একটা খাট ছাড়া আর কিছু নেই। এই সময়টায় অনেক পরিবার একসঙ্গে সব কিনতে যায়। ফার্নিচারের দোকানে একদিনে সোফা, খাট, আলমারি, ডাইনিং টেবিল, পর্দা, ফ্রিজ আর টিভি স্ট্যান্ড দেখে বাজেটের হিসাবটা হাতের বাইরে চলে যায়। অথচ সাজানোর কাজটা ধাপে ধাপে করলে একই ঘর অনেক কম টাকায় গুছিয়ে ওঠে।
মূল নীতিটা সহজ। আগে বাঁচার জন্য যা দরকার, তারপর আরামের জন্য যা ভালো, আর সবার শেষে শুধু দেখতে সুন্দর যা। এই ক্রমটা মানলে টাকা শেষ হওয়ার আগেই ঘরটা বাসযোগ্য হয়ে যায়।
প্রথম সপ্তাহ: ঘুম, রান্না আর ধোয়া
প্রথমে টাকা যাবে তিনটি জায়গায়। ঘুমের ব্যবস্থা, রান্নার ব্যবস্থা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা। একটা ভালো খাট আর গদি, রান্নাঘরের জন্য প্রয়োজনীয় হাঁড়ি-পাতিল আর গ্যাসের চুলার সংযোগ, আর বাথরুমের জন্য মৌলিক সরঞ্জাম। এই তিনটি ছাড়া নতুন ঘরে থাকা যায় না, তাই এখানে কার্পণ্য করলে রোজকার জীবনই কষ্টকর হয়।
পর্দা এই ধাপে অনেকেই ভুলে যান, কিন্তু ঢাকার ফ্ল্যাটে পর্দা বিলাসিতা নয়। রোদের তাপ আর পাশের ভবন থেকে দৃষ্টি আটকাতে মোটা না হলেও হালকা পর্দা প্রথম সপ্তাহেই লাগে। একইভাবে ঘরের তালা, জানালার ছিটকিনি আর বাথরুমের কল ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা ওঠার দিনই পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। ছোট মেরামত পরে করব বলে ফেলে রাখলে সেটাই দৈনন্দিন বিরক্তির কারণ হয়।
ঘর ধরে অগ্রাধিকার
শোবার ঘরে খাট আর আলমারি আগে। আলমারি কেনার আগে দেয়ালের মাপ নিন, আর ভাবুন কত জামাকাপড় আসলে রাখতে হবে। ঢাকার ছোট ফ্ল্যাটে দেয়ালজোড়া আলমারি জায়গা খেয়ে ফেলে, তার চেয়ে মাপমতো আলমারি আর কিছু ঝুলন্ত তাক অনেক সময় ভালো কাজ দেয়। ড্রেসিং টেবিল প্রথম মাসে না হলেও চলে।
বসার ঘরে সোফা একটা বড় খরচ। এখানে সাশ্রয়ের উপায় হলো আকার। ঘরের মাপের চেয়ে বড় সোফা কিনলে চলাচলের জায়গা কমে যায়, আর ঘরটা ছোট লাগে। ছোট সোফা আর একটা হালকা টেবিল দিয়ে শুরু করুন। টিভি স্ট্যান্ড, শোকেস আর সাজানোর জিনিস পরে ধীরে ধীরে আসতে পারে। বই রাখার তাক থাকলে সেটাই বসার ঘরের চরিত্র গড়ে দেয়, দামি শোকেস ছাড়াই।
রান্নাঘরে খরচের ক্রমটা উল্টো। এখানে কাজের জিনিস আগে, দেখতে সুন্দর জিনিস পরে। ভালো র্যাক, মসলা রাখার ডিব্বা, পানি ঝরানোর ব্যবস্থা আর আলো। আলো কম থাকলে রান্নাঘরে কাজ করা কষ্টকর হয়, তাই একটা উজ্জ্বল বাতি লাগানো ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খরচ। দামি টাইলস বা নতুন ক্যাবিনেট শাটার পরে বদলানো যায়, কিন্তু রান্নার জায়গাটা গোছানো না থাকলে প্রতিদিন সময় নষ্ট হয়।
বাচ্চাদের ঘর আর বারান্দা নিয়েও ভাবুন। বাচ্চাদের ঘরে পড়ার টেবিল আর আলো আগে, সাজানোর জিনিস পরে। বারান্দায় প্রথমে দরকার শুধু একটা বসার জায়গা আর গাছ রাখার ব্যবস্থা, যদি আলো-বাতাস ঠিক থাকে। বারান্দা সাজানোর খরচটা ছোট মনে হলেও টব, স্ট্যান্ড আর আলো মিলে অঙ্কটা বড় হয়, তাই সেটাও ধাপে ধাপে করুন।
কী কী পরে কিনলেও চলে
কিছু জিনিস পরে কিনলে কোনো ক্ষতি হয় না, বরং সুবিধা হয়। কারণ ঘরে কিছুদিন থাকার পর বোঝা যায় আসলে কী দরকার। ডাইনিং টেবিল প্রথমে না কিনে ছোট টেবিলে খাওয়া যায়। বাচ্চাদের ঘরের সাজসজ্জা, বারান্দার টব, দেয়ালের ছবি, অতিরিক্ত চেয়ার, সবই অপেক্ষা করতে পারে।
সবচেয়ে বড় সাশ্রয় হয় সিদ্ধান্ত ধীরে নিলে। নতুন ফ্ল্যাটে প্রথম মাসে যা মনে হয় অপরিহার্য, দ্বিতীয় মাসে তার অনেক কিছুই আর তত জরুরি মনে হয় না। একটা তালিকা বানিয়ে রাখুন। যা কিনতে চান, তার পাশে তারিখ লিখুন। এক মাস পরেও যদি সেটা দরকার মনে হয়, তখন কিনুন। এই অভ্যাসটা শুধু টাকা বাঁচায় না, ঘরে অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমাও ঠেকায়।
কেনাকাটায় কয়েকটি বাস্তব কৌশল
ঢাকায় ফার্নিচার কেনার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে মান আর দাম দুটোই ভালো পাওয়া যায়। কাঠের ক্ষেত্রে সিজন করা কাঠ আর জয়েন্টের কাজ দেখে নিন, শুধু রং দেখে নয়। ফোমের গদিতে ঘনত্ব জিজ্ঞেস করুন, আর বসে পরীক্ষা করুন। দোকানের আলোয় যা সুন্দর লাগে, ঘরের আলোয় তা একরকম নাও লাগতে পারে। সম্ভব হলে নমুনা ঘরে এনে দেখুন।
পুরোনো আসবাব নতুন করে ব্যবহার করাও বাজেটের বড় সহায়। আগের বাসার খাট, টেবিল বা আলমারি নতুন ঘরে মানিয়ে গেলে নতুন কেনার দরকার নেই। রং করে বা কাপড় বদলে পুরোনো জিনিস নতুনের মতো লাগতে পারে। পরিবারের কারও কাছে অতিরিক্ত আসবাব থাকলে সেটা নেওয়ার কথা ভাবুন। লজ্জার কিছু নেই, ঘর গোছানোই আসল কথা।
আর একটা খরচ মাথায় রাখুন, পরিবহন আর মিস্ত্রি। ফার্নিচার কেনার দামের সঙ্গে ডেলিভারি, ওপরে তোলা আর ফিটিংয়ের খরচ যোগ করলে মোট অঙ্কটা বদলে যায়। কেনার আগেই এই খরচগুলো জিজ্ঞেস করে নিন, যাতে শেষ মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত বিল না আসে।
নতুন ঘর সাজানো একদিনের কাজ নয়, কয়েক মাসের ধারাবাহিক কাজ। প্রথমে বাঁচার ব্যবস্থা, তারপর আরাম, তারপর সৌন্দর্য। এই ক্রমটা ধরে এগোলে বাজেট ভাঙবে না, আর ঘরটা ধীরে ধীরে সত্যিকার অর্থে নিজের হয়ে উঠবে।




