রংপুর শহরের দক্ষিণ-পূর্বে তাজহাটে গেলে সাদা প্রাসাদটা দূর থেকেই চোখে পড়ে। চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে স্তম্ভের বারান্দার দিকে, ওপরে গম্বুজ, সামনে সবুজ মাঠ। ভেতরে এখন আর জমিদার পরিবারের সংসার নেই। আছে রংপুর জাদুঘর, পুরোনো ভাস্কর্য, পাণ্ডুলিপি আর মাটির নিদর্শন। প্রাসাদ দেখতে আসা মানুষ তাই একসঙ্গে দুটি জিনিস দেখে: একটি পরিবারের উচ্চাশা, আর একটি অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাস।

তাজহাট প্রাসাদের গল্প শুরু হয় ব্যবসা থেকে। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, তাজহাট নামটি এসেছে মান্না লাল রায়ের তাজ বিক্রির হাট থেকে। তাঁর বংশধর গোবিন্দ লাল রায়ের ছেলে গোপাল লাল রায়, যিনি মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় নামে পরিচিত, এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার শ্রমিক ১০ বছর ধরে, ১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত, নানা নকশা আর কারুকাজে ভবনটি গড়ে তোলেন। সে সময় নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। ভবনের সামনের দিকের দৈর্ঘ্য ৭৬ দশমিক ২০ মিটার, আর কক্ষ আছে ২৮টি, এমন তথ্য বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়।

মুঘল আর ইউরোপীয় ধারার মিশেল

Estate News — Find your dream home

প্রাসাদের স্থাপত্যে মুঘল আর ইউরোপীয় ধারার মিশেল দেখা যায়। চওড়া মার্বেল সিঁড়ি, স্তম্ভ, খিলান, আর ছাদের মাঝখানে পাঁজরযুক্ত গম্বুজ, এসব মিলে ভবনটিকে রাজকীয় চেহারা দিয়েছে। গোপাল লাল রায় ছিলেন পেশায় জহুরি, পরে জমিদার। তাঁর পরিবারের উত্থান ছিল ব্যবসা আর জমিদারির মিশেলে, আর প্রাসাদটি ছিল সেই উত্থানের প্রকাশ। বড় বাড়ি বানানোই তখন মর্যাদার ভাষা ছিল, আর তাজহাট সেই ভাষায় লেখা একটি বড় বাক্য।

তবে জমিদারি আমল স্থায়ী হয়নি। ১৯৪৭ সালের পর এই জমিদার বাড়ি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং ৫৫ একর জমিসহ কৃষি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়, এমন তথ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আছে। পরে প্রাসাদ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এখানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রংপুর শাখা চলে। একটি প্রাসাদ আদালত হওয়া, তারপর জাদুঘর হওয়া, এই বদলই বলে দেয়, ভবন টিকে থাকে যখন তার ব্যবহার বদলায়, কিন্তু তার কাঠামোকে সম্মান করা হয়।

জাদুঘর হওয়ার পরের জীবন

Estate News free property calculators

১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তাজহাট জমিদার বাড়িকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘর প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়। জাদুঘরে আছে দশম ও একাদশ শতকের পোড়ামাটির নিদর্শন, সংস্কৃত আর আরবি পাণ্ডুলিপি, আর কালো পাথরের হিন্দু ভাস্কর্য, যার মধ্যে বিষ্ণুর মূর্তি উল্লেখযোগ্য। এসব নিদর্শন শুধু প্রাসাদের নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের পুরোনো জীবনের সাক্ষ্য। একজন দর্শক সিঁড়ি দিয়ে উঠে, বারান্দা পেরিয়ে, জাদুঘরের ঘরে ঢুকে আসলে দুটি সময়ের মধ্যে হাঁটে: প্রাসাদের সময়, আর তার চেয়ে অনেক পুরোনো সময়।

তাজহাট প্রাসাদের চওড়া মার্বেল সিঁড়ি আর স্তম্ভের বারান্দা, সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন পাঞ্জাবি আর সালোয়ার কামিজ পরা দর্শনার্থী

রংপুরের জন্য প্রাসাদের মানে

তাজহাট প্রাসাদ রংপুরের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে, কারণ এটি শুধু পুরোনো ভবন নয়, শহরের একটি গন্তব্য। পরিবারগুলো এখানে বেড়াতে আসে, শিক্ষার্থীরা ইতিহাস দেখতে আসে, আর গবেষকরা উত্তরবঙ্গের জমিদারি ব্যবস্থা বুঝতে আসে। প্রাসাদের চারপাশের মাঠ আর গাছপালা এই ভ্রমণকে শুধু ঘর দেখা থেকে একটি দিনের অভিজ্ঞতায় বদলে দেয়।

এই ধরনের ভবনের যত্নের প্রশ্নটাও এখানেই আসে। সাদা প্লাস্টার, মার্বেল সিঁড়ি, গম্বুজ আর কাঠের কাজ, সবই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চায়। বৃষ্টি, রোদ আর সময়ের সঙ্গে এগুলো নষ্ট হয়। সংরক্ষিত ঘোষণা আর জাদুঘর হওয়া ভবনকে একটি উদ্দেশ্য দিয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকলেই যত্ন আপনাআপনি হয় না। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে, ভবনের ভেতরের চলাচল, আলো, আর সংরক্ষণের নিয়মও সেই সঙ্গে ভাবতে হয়।

তাজহাট প্রাসাদ তাই গর্বের পাশাপাশি একটি সতর্ক বার্তাও দেয়। জমিদারি আমল শেষ হয়েছে, কিন্তু তার স্থাপত্য থেকে গেছে। সেই স্থাপত্য যদি যত্ন পায়, তাহলে রংপুরের আগামী প্রজন্মও চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে, গম্বুজের নিচে দাঁড়িয়ে, নিজের অঞ্চলের ইতিহাস হাতের নাগালে পাবে। একটি প্রাসাদ তখনই জীবন্ত থাকে, যখন মানুষ তাতে আসে, আর আসার কারণ খুঁজে পায়। তাজহাটে সেই কারণ এখন জাদুঘর, মাঠ, আর ইতিহাসের সঙ্গে একটি সরাসরি দেখা।