ফ্ল্যাটের ভেতরের গল্পটা যেখানে শুরু

একটি ফ্ল্যাট দেখতে গেলে ক্রেতার চোখ প্রথমে যায় মেঝের দিকে। টাইলসের রঙ, জয়েন্টের সোজা ভাব, বাথরুমের ফিটিংসের পরিচ্ছন্নতা, এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই প্রথম ধারণা তৈরি করে। অথচ বাড়ি বানানোর খরচের আলোচনায় এই শিল্পটা প্রায়ই পেছনে থাকে। সিমেন্ট আর রডের দাম নিয়ে কথা হয়, কারণ সেগুলো কাঠামোর খরচ। টাইলস আর সিরামিকের কথা কম হয়, কারণ সেগুলো ফিনিশিংয়ের খরচ। কিন্তু ফিনিশিংই সেই অংশ, যার সঙ্গে বাসিন্দা প্রতিদিন বসবাস করেন। মেঝেতে পা রাখা, বাথরুম ব্যবহার করা, রান্নাঘরে কাজ করা, সবই এই উপকরণের ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশে এই শিল্প এখন আর ছোট নয়। The Business Standard-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশীয়ভাবে তৈরি পণ্য এখন দেশের টাইলস বাজারের প্রায় ৮২ শতাংশ, স্যানিটারিওয়্যারের ৬৫ শতাংশ আর টেবিলওয়্যারের ৮৯ শতাংশ জোগায়। এই সংখ্যাগুলো একটা বড় পরিবর্তনের কথা বলে। একসময় ভালো টাইলস মানেই আমদানি করা পণ্য, এই ধারণা ছিল। এখন দেশের কারখানাতেই নানা ধরনের টাইলস, স্যানিটারি পণ্য আর টেবিলওয়্যার তৈরি হয়, আর সেগুলো দেশের বাজারেই বিক্রি হয়।

Estate News — Find your dream home

গাজীপুরের কারখানা থেকে সারা দেশের দোকান

এই শিল্পের বড় নামগুলোর মধ্যে RAK সিরামিকস বাংলাদেশ অন্যতম। কোম্পানিটি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে ২০০০ সালে, আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের RAK সিরামিকসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ হিসেবে কাজ করে। এর কারখানা গাজীপুরের শ্রীপুরে, ঢাকা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। Daily Star-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির সারা দেশে ৩০০টি বিক্রয় কেন্দ্র আর ১৫০ জন ডিলার ও সাব-ডিলারের নেটওয়ার্ক আছে। টাইলস আর স্যানিটারিওয়্যারের পাশাপাশি কোম্পানিটি বাথরুম সেট, বেসিন, ফসেটসহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রি করে।

কারখানার খবরও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। Daily Star জানিয়েছে, RAK সিরামিকসের একটি টাইলস লাইন নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের পর উৎপাদনে ফিরেছে, আরেকটি লাইন ২৪ আগস্ট থেকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ আছে। তৃতীয় লাইন চালু হওয়ার পর কোম্পানিটি চারটি টাইলস লাইনের মধ্যে দুটি চালাচ্ছে, প্রথম লাইনের পাশাপাশি। এই তথ্যটা শুধু কোম্পানির খবর নয়। এটি দেখায়, উৎপাদন ক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ আর সরবরাহ, এই তিনটি বিষয় কীভাবে বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতার সঙ্গে যুক্ত। একটি লাইন বন্ধ থাকলে সরবরাহ কমে না, যদি অন্য লাইনগুলো চালু থাকে, কিন্তু বড় প্রকল্পের ক্রেতারা সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন।

RAK ছাড়াও দেশে আরও অনেক সিরামিক কোম্পানি কাজ করছে, যেমন ডিবিএল সিরামিকস, যার কারখানাও গাজীপুরে। একসঙ্গে এই কোম্পানিগুলো ঢাকার শোরুম থেকে জেলা শহরের দোকান পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেয়। শহরের বাজারে বিক্রির হার বেশি, গ্রামের বাজারেও চাহিদা বাড়ছে, কারণ গ্রামে পাকা বাড়ি বানানোর হার বেড়েছে। এই বিস্তার শিল্পের জন্য ভালো খবর, কারণ এটি শুধু ঢাকার আবাসন বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়।

টাইলসের ধরন বুঝলে খরচ বোঝা সহজ হয়

Advertise on Estate News

টাইলস কিনতে গেলে প্রথমে ধরন বুঝতে হয়। সাধারণ সিরামিক টাইলস দেয়াল আর হালকা ব্যবহারের মেঝের জন্য ব্যবহৃত হয়। পোর্সেলিন বা ফুলি ভিট্রিফায়েড টাইলস বেশি শক্ত, কম পানি শোষণ করে, আর বেশি চলাচলের জায়গায় ভালো টেকে। রাস্টিক বা ম্যাট ফিনিশের টাইলস পিচ্ছিল কম হয়, তাই বাথরুম আর বারান্দায় অনেকে এটা পছন্দ করেন। গ্লসি টাইলস আলো প্রতিফলিত করে, ঘর বড় দেখায়, কিন্তু ভেজা অবস্থায় পিচ্ছিল হতে পারে। এই পার্থক্যগুলো দামের পার্থক্য তৈরি করে, আর ব্যবহারের জায়গা অনুযায়ী সঠিক ধরন বেছে নিলে পরে মেরামতের খরচ কমে।

স্যানিটারিওয়্যারের ক্ষেত্রেও একই কথা। কমোড, বেসিন, ফসেট, শাওয়ার, এই প্রতিটি পণ্যের মান আর ডিজাইনে পার্থক্য আছে। সস্তা ফিটিংস প্রথমে খরচ কমায়, কিন্তু লিকেজ, দাগ আর বদলানোর খরচ পরে বেড়ে যায়। ভালো ফিটিংসের দাম বেশি, কিন্তু তার আয়ু বেশি। বাড়ি বানানোর বাজেটে এই হিসাবটা রাখা উচিত। শুধু প্রতি বর্গফুট টাইলসের দাম নয়, ফিটিংসের মান, মিস্ত্রির কাজের মান, আর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, এই তিনটি মিলিয়ে আসল খরচ বোঝা যায়।

কেনার আগে যা দেখে নেবেন

টাইলস কেনার সময় কয়েকটি বিষয় হাতে-কলমে যাচাই করা যায়। প্রথমে দেখুন টাইলসের রঙ আর ডিজাইন একই লটের মধ্যে মিলছে কি না। আলাদা লটের টাইলসে রঙের সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, আর মেঝেতে বসানোর পর সেটা চোখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, টাইলসের প্রান্ত সোজা কি না, আর আকারে সমতা আছে কি না, সেটা দেখুন। বাঁকা টাইলস বসাতে গেলে জয়েন্ট অসমান হয়। তৃতীয়ত, বাথরুম আর বারান্দার জন্য পিচ্ছিল-প্রতিরোধী ফিনিশ বেছে নিন। চতুর্থত, অতিরিক্ত টাইলস কিনে রাখুন, কারণ পরে একই লট নাও পাওয়া যেতে পারে, আর ভাঙা টাইলস বদলাতে গেলে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।

সরবরাহকারীর বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিলারের কাছ থেকে কেনার সময় বিল, ওয়ারেন্টি আর লট নম্বর সংরক্ষণ করুন। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ডেভেলপারের কাছ থেকে জানতে চান কোন ব্র্যান্ড আর কোন ধরনের টাইলস ব্যবহার করা হচ্ছে, আর সেটা চুক্তিপত্রের স্পেসিফিকেশনে লেখা আছে কি না। স্পেসিফিকেশনে লেখা থাকলে পরে বদল করা কঠিন হয়, আর না থাকলে ক্রেতার হাতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম থাকে।

সিমেন্ট-রডের বাইরে একটা পুরো শিল্প

সিমেন্ট আর রড ছাড়া বাড়ি দাঁড়ায় না, এটা সত্যি। কিন্তু বাড়ি বাসযোগ্য হয় টাইলস, সিরামিক, রঙ, কাচ, ক্যাবল আর ফিটিংসের মতো উপকরণ দিয়ে। এই উপকরণগুলোর শিল্প এখন দেশেই বড় হচ্ছে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ছে, আর ডিজাইনের বৈচিত্র্যও বাড়ছে। RAK সিরামিকসের মতো কোম্পানির কারখানা, ডিলার নেটওয়ার্ক আর নতুন পণ্যের খবর এই শিল্পের গতির ইঙ্গিত দেয়। বাড়ি বানাতে চাওয়া পরিবার আর ফ্ল্যাট কিনতে চাওয়া ক্রেতা, দুই পক্ষের জন্যই এই শিল্পটা জানা দরকার। কারণ শেষ পর্যন্ত ঘরের মেঝে, বাথরুম আর রান্নাঘরের মানই ঠিক করে দেয়, বাড়িটা দেখতে কেমন, আর থাকতে কেমন লাগবে।